সমাজের বর্ণ স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকায় আপনাকে স্বাগত ~ Welcome to Sworobarna Literary Magazine | এই বছরের নতুন নিবেদন -- সমাজের বর্ণ | অণুগল্পে সমাজের নানান রং এর মেলা | রবিবর্ণ | স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা - ২০২১ 🙏 ধন্যবাদ ~ Thank You 🙏 মা দেবীকা মিস্ত্রী সঞ্জীবনী প্রথম যেদিন মিমিকে দেখেছিল, বাঁচিয়েছিল একটি বড়োসড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার হাত থেকে। কোলে তুলে নিয়েছিল ছোট্ট মিমিকে।সেদিন মিমিও সঞ্জীবনীর বুকে মাথা রেখে, বেঁহুশ হয়ে "মা" বলে ডেকেছিল। সঞ্জীবনীর মধ্যে জেগে উঠেছিল মা-এর একটি রূপ। সেই ঘটনার পর, বহুবার সঞ্জীবনী মিমির সাথে দেখা করার চেষ্টা করে। কিন্তু, তাকে মিমির কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। মিমিও অনেকবার সঞ্জীবনীর কাছে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। ঠিকই তো, সঞ্জীবনীকে ছোট্ট মিমির কাছে কেন আসতে দেবে এই সুস্থ সমাজ। সে যে, নপুংসক, হিজড়া, ছক্কা। কারোর কারোর চোখে ...
বিশ্ব জুড়ে চলছে মহামারি, করোনা ভাইরাস। এই সংকটময়, দুর্দিনে চারদিকে লকডাউনের একঘেয়ে কাটাতে আমাদের এই উদ্যোগ যাতে সাহিত্যানুরাগী ব্যাক্তিরা সাহিত্য থেকে বঞ্চিত না হন। স্বরবর্ণ হল একটি ফেসবুক পেজ, সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এবং সাহিত্য কে বাঙালির মননে বজায় রাখতে যার সৃষ্টি। অনেকটা পথ চলার পর এবার প্রকাশিত হল স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা, বৈশাখ সংখ্যা। এই পত্রিকা একটি ওয়েব ম্যাগাজিন রূপে প্রকাশিত।
পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করতে যেসব লেখক, কবি দের সৃষ্টি গৃহিত হয়েছে তাদের প্রত্যেককে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন। বহু সাহিত্যিকের লেখা আমার কাছে এসেছে কিন্তু যেহেতু সর্বশ্রেষ্ঠ লেখাই নির্বাচিত হয়ে থাকে তাই সকলের লেখা এখানে প্রকাশ করা গেল না। যাদের লেখা মনোনিত হয়নি তাদের কাছে অনুরোধ আপনারা আপনাদের সাহিত্যচর্চা বজায় রাখুন এবং আরো লিখুন। সর্বমোট তিরিশ জনের লেখা স্বরবর্ণ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় তুলে ধরা গেল। পরবর্তীকলে আশা করি এর চেয়ে অধিক সংখ্যায় লেখা পাব। কবিতা, ছড়া, গল্প নিয়ে গঠিত এই পত্রিকার যেকোনো অংশে যদি কোনো ভুল-ত্রুটি থেকে থাকে তবে তা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন। সূচীপত্র এখানে রাখা হল না এই কারণে যে আপনারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের লেখা পড়ুন এবং নিঃসংকোচে মতামত প্রদান করুন।
সর্বোপরি, আশা করি এই পত্রিকা আপনাদের ভালোবাসা এবং যেকোনো রকম সমালোচনা জোগার করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে আপনাদের সহোযোগিতার দ্বারা আমাদের পথ আরো সুপ্রসস্থ হবে।
সকলে ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আমরা খুব শীঘ্রই এই বিপর্যয় কাটাতে সমর্থ হব।
ধন্যবাদান্তে,
অনিরুদ্ধ ঘোষ, সম্পাদক
স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা
কবির কবিতা
ক্রসিং
সাত্যকি
একটুও ছোঁয়া লাগল না
একটুও ছোঁয়া লাগে নি
যেমন ভাবে পথচলতি
যেমন ভাবে শিয়ালদহ
রেল ক্রসিংয়ের ট্রেন
ঠিক তেমন
চোখের থেকে চোখ
হাতের পাশে হাত
মাঝে আকাশের মতো
সুনির্দিষ্ট ব্যবধান
তোমার ঠোঁট বলতে চেয়েছিল
আমি বেশ বুঝেছি
কিন্তু বরাবরের মতো
তুমি বড্ড বেশি সাবধানী
বললে না
আমিও তেমনি
শ্রাবণের মেঘের মতো
গাম্ভীর্যের ভার নিয়ে
বসে থাকলাম বৃষ্টির অপেক্ষায়
কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম
বৃষ্টি সেদিন আর হল না
হাওয়াতেই মেঘ উড়ে গেল
সেদিন তোমার ঠোঁটের অলসতা
একইভাবে আজও
শিয়ালদহের ক্রসিং দিয়ে
যেমন চলে যায় ট্রেন কোনো
ছোঁয়াচ না দিয়ে
সেদিন থেকে অনেকটা ব্যবধান
উল্টো পথের আকাশ দেখছি দুজন
আজ খুব জানতে ইচ্ছে করে
মনে পড়ে ফেলে আসা ওয়েটিং রুম...
যন্ত্রনা
রত্না নাথ
প্রতি রাতে নতুন নতুন যন্ত্রনা ....
একটা ভয়ংকর মুখ সামনের আয়নায় ,
মনের গভীরে তরঙ্গ তোলে ভয় , স্পর্শ পাই ...
বিকট চিৎকারে ছিটকে যায় সময়ের ভাবনা ,
অনুভূতির টুকরো পোশাক খুলে সে উলঙ্গ ...
হিংস্র নখের আঁচড়ে ছিন্ন ভিন্ন ...
ছোটো বেলার লালিত স্বপ্ন ডুকরে ওঠে ,
ভেসে যায় শান্তির ভেলা , ডুবে যায় সুখ,
শরীর ঘিরে দাপিয়ে বেড়ায় উৎকণ্ঠা ..
আবার যদি ফিরে আসে সেই যন্ত্রনা !
কালের সীমানায় আঘাত হানে ..
দীর্ঘ সময় নেয় মনের গহবরে ,
নীল দাঁতের থাবা বসায় ...
ছিড়ে ফেলে ভালোবাসার ডানা ,
তবু মুক্ত করো আমায় প্রতি রাতের যন্ত্রণা ।
লুকোচুরি
সায়ন্তন ঘোষ
ছদ্মবেশে রয়েছে মনে
চিনতে পারা দায়।
চিনতে বুঝতে পেরেছি যখন
বুঝলাম, আমার পোড়া কপাল হায়।
রয়েছো তুমি মনের মধ্যে
লুকিয়ে ছিলে কোথা,
তোমায় চিনতে না পেরে
মনের কোণে লাগে ব্যথা।
লুকোচুরি ছদ্মবেশে
খেলা করেছো তুমি,
জ্যোৎস্না রাতে চাঁদের আলোয়
ভেদ করেছো মনের ভূমি।
সব খুঁজে পাই, পাই না শুধু
লুকিয়ে যাওয়া মানুষ;
মনের কোণে লুকিয়ে সবার
হারিয়ে গেছে হুঁশ।
রূপান্তর
শ্রী শতানীক ভট্টাচার্য
প্রতিদিন একটা ভোর হয়
এক একটা করে খোলস ওঠে,
নতুন করে জন্ম নিই!
সবার রঙে রং মেশাই
ভেঙে গড়ে পাল্টাই আমি--
হঠাৎ মেঘের বানানো গল্পের মত
আর ঝরে পড়ি বৃষ্টি হয়ে!
চলো রামধনুজীবন বাঁচি,
বাঁচি লতাগুল্মের জীবন!
অসময়ে,
শুঁয়োপোকার প্রজাপতি স্বপ্ন
আর গিরগিটির জঘন্য অভিযোজন!!
ঊষর
মিতালি চক্রবর্তী
তারপর, পায়ে পায়ে চলা পথ অনায়াস হয়ে ওঠে
একদম সাতপাঁচ ভেবে রাখা সাধারণ গৃহস্থের দ্বারঘট বসানো চৌকাঠে,
সত্তা আর সতীত্ব লয়কারি তান ধরে
দোতারার দুইখানি তারে।
ভেসে যায় কাঁচের হৃদয়
আসলে ইঁটকাঠ দিয়ে
ঘেরা ছিল কিছুটা সময়।
যাপন টুকু থেকে যাবে ধুলোমাখা অতীতের মত
একান্ত মুহূর্তগুলো অসহিষ্ণু স্বয়মাগত,
এগোনো ঘড়ির কাঁটা
বন্ধ দরজার কাছে ,
অবিকল ছিল আজ ও আছে।
অবুঝ হুল্লোড়
শঙ্খশুভ্র পাত্র
হুল্লোড় কিছু বোঝে না, জানো —
তাইতো বাঁধায় গোল,
'অঙ্ক' মানেই কেবল গণিত
বোঝে না মায়ের 'কোল' ৷
সেদিন টিচার বললেন ক্লাসে :
কাল মে-ডে-র ছুটি,
হুল্লোড় শুনে প্রতিবাদ করে
সবার সামনে উঠি ৷
কেন স্যার, এই অবিচার আজ
শুধু ছেলেদের পক্ষে ?
মেয়েদের প্রতি সহানুভূতি
দেখবো না আমি চক্ষে ৷
শুনে শিক্ষক হেসে বললেন :
ওহে হুল্লোড় চন্দ,
মেয়েদের নয় — May day-র ছুটি
কাল ইস্কুল বন্ধ ৷
কণ্টকিত পেলবতা
উৎস ভট্টাচার্য
গোলাপের পেলবতা উপহার দিতে চাওয়া—
চিরকাল একই স্রোতে প্রেমিকের ভাবনা৷
গোলাপের রঙ নাকি অর্থবহ হতে চায়!
গাঢ় লাল প্রণয়ের দূত হয়ে আসে৷
সত্যই সুন্দর—সুন্দরে ঈশ্বর৷
গোলাপও তো সুন্দর প্রেমিকের চেতনায়!
প্রেমকে সত্য জেনে সুন্দর-সাধনায়৷
গোলাপের পেলবতা ভালোবেসে একাকার৷
প্রেমের স্বর্গোদ্যানে পুষ্পিত সুন্দর!
সুরভিত মনোলোভা অপরূপ বর্ণ!
প্রেমের মাঝে যেমন মিশে বিরহের বেদনা—
পেলব পুষ্পে লুকিয়ে থাকে ধারালো কণ্টক৷
হায়! পেলবতাও কণ্টকিত—বিধির বিধান!
প্রেমবিরহের মিশেল যেন গোলাপে সমাহিত!
বিশ্বাস
সুদীপ পাল
বিশ্বাসে ফাটল ধরলে
লুকিয়ে থাকা আগাছা
বংশবিস্তার করে অতিদ্রুত -
প্রতিটি বিশ্বাসে
দীর্ঘ ফাটল লুকিয়ে থাকে।
সন্দেহের স্ফুলিঙ্গে
বারুদ হয়ে ঝলসে ওঠে।
আরো একটা বিষন্ন সকাল
কণিকা দাস
যেভাবে সকাল হলে মনের ক্যানভাসে
ঘাসেরা সবুজ হয়
হৃদয়স্পর্শী দখিনা বাতাস ছুঁয়ে যায়
সরোবরের শতদল
দূর নীলিমার মেঘ হেসে অভিবাদন জানায়।
এমনই একটা সকালের প্রত্যাশায়
সারা রাত ধরে জেগে থাকি…
শেষ রাতে ক্লান্তির ঘুম পেরিয়ে
হঠাৎ জেগে দেখি
আমার সরোবরে অকাল বন্যা
উপচে পড়ে কয়েক ফোঁটা উথাল ঢেউ
পাড় ভাঙার শব্দ সারাদিন
ভাঙ্গা মন নিয়ে ভেসে বেড়াই অতীত পথে
বর্ষার ভিজে বাতাসে চাপ চাপ শূন্যতা
এর চেয়ে আগুন ছিল ঢের ভালো।
মূল্যবোধ
সোমনাথ খাঁড়া
যন্ত্রদানবের যুগে মানুষ অাজ সর্বাগ্রে উন্নত,
টাকার অঙ্কে মূল্যবোধ নেই অার অক্ষত;
ভালোবাসা যেন অাজ বুদবুদের মত ক্ষীণ,
সবকিছু জেনেশুনেও মানুষ আজ থেকেছে মৌন।
সবাই শুধু নিতে শিখেছে নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে,
অন্যকে পিছনে ঠেলে নিজে চায় যেতে এগিয়ে।
অাত্মীয়রা আজ পর,আগে দেখে নিজের মান-যশ,
অসৎ পথে যেতে গিয়ে ডেকে অানে নিজের চরম সর্বনাশ।
গুরুজন-প্রীতি-সম্মান করতে গিয়ে তাদের হয় কুণ্ঠাবোধ,
বিপদে পড়লে সাহায্যপ্রার্থী হতে পারে না নির্লজ্জবোধ।
এদের দেখে শিখবে নাকি ভাবী প্রজন্মের শিশু,
সমাজের হবে নাকো কোনো কল্যাণ,
এইভাবে হচ্ছে মানবিকতার মৃত্যু।।
দর্পণ
তীর্থঙ্কর সুমিত
এভাবেই কেটে গেছে
আরো কত দিন
রাতের ত্রাহি ত্রাহি রব।
চেয়ে আছে সকাল
সময়ের সুতো ঝুলছে,
হাত বাড়িয়েছে ইতিহাস
ব্যর্থতা সে তো আলাপনের দর্পণ।
গন্তব্যহীন গন্তব্য
অনুকূল বিশ্বাস
লাল নদী একদিন থেমে যাবে
নীল প্রবাহ করবে তাকে গ্রাস ।
অজান্তে, শ্যাওলা গতি করে রোধ ,
বেড়ে ওঠে পাথরের টিলা থরেথরে
রক্তিম প্রবাহ ভুলে যায় অচিন গন্তব্য।
তখন সেই জলে সাঁতার কাটতে থাকে না কেউ
জেগে ওঠে অসমতল চর;
সেদিন তুমি একা , শুধুই একা
একাকিত্ব সঙ্গী লড়াই জীবন্তকাল।
চারিদিকে অথৈ শূণ্যতা, অস্পষ্ট নির্জনতা;
তুমি সেদিন একলব্য সত্যের মুখোমুখি
যা খন্ডানো তোমার ক্ষমতার অতীত;
একদিন যার কাছে পেয়েছিলে বাঁচার স্বাধীনতা।
চোখ মেলে আছো তবুও গুহার অন্ধকার
শিহরণ জাগানো নির্বীকার শীতলতা,
তুমি দৃশ্যের মাঝেও অদৃশ্য,
সকলের মনে বাস করেও তুমি নিঃসঙ্গ।
যেদিন এসেছিলে শাখ-উলুতে হয়েছিল আহ্বান;
আজ শুধুই ফ্যাকাশে জয়ধ্বনি ,
মন খারাপের বাতাস বড্ড ভারী
বেদনায় রজনীগন্ধা ঝরে পড়ে অনাদরে।
এসেছো তাই তো ফিরতে হবেই বন্ধু,
সময়ের লাল জবা সব ঝরে গেছে---
সাঙ্গ হয়েছে লীলা, কর্তব্যের দায় হয়েছে সমাপ্ত,
তৈরি হও, দিতে হবে পাড়ি গন্তব্যহীন গন্তব্যে।
বাঁকা বাঁশের বাঁশরী
শুভাশিস দাস
সাড়ে নয়বার "ছিন্নপত্র" পড়েও
রবি ঠাকুরকে ঠিক ছুঁতে পারিনি,
তাঁর মনস্তত্ব আর আমার বোধশক্তির
মাঝে অনুভব করি এক আলোকবর্ষ পথ,
কবিগুরুর লেখা গান 'রবীন্দ্র সংগীত'
আর "অগ্নিবীণা"র বাদক লিখলে "নজরুলগীতি" কেন হয়
সেটা যারা বোঝেনা তারাই হয়তো
ঠিক করেন কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ,
রবীন্দ্রজয়ন্তী না নজরুল স্মরণ?
স্রষ্টার আবার জাত কি,
পাণ্ডুলিপিরা তো ভেদাভেদ মানেনি,
কবিদের খাগের কালিরা তো ফারাক খোঁজেনি হিন্দু-মুসলিম পাঁচিলে ।
তবে এখনও কেন অদৃশ্য বিরোধ
রবীন্দ্র-নজরুলে?
বিছানা
অর্কজ্যোতি ভট্টাচার্য্য
শরীর এলিয়ে দিলে কিছুক্ষণ চুপচাপ
এক মিনিট নীরবতা পালনের পর
আমরা ছটফট করি ৷
ডানা ঝাপটাতে থাকা পাখিটার ঠোঁটে
লেগে আছে রাতের পোশাক,
একে একে যেগুলো আমরা খুলে রেখেছি
বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে ।
আত্মরক্ষা
তৈমুর খান
নৌকা ভেসে গেছে
বন্যা আসক্ত নদীও;
প্রেমের বৈঠারা কে কোথায় ?
হাসিকান্নার জলে বিস্ময় তরঙ্গ তট ভাঙে,
সততার বিকল্প ছিল না যদিও
এসময় ভেসে গেছে সেও ,
নিজের ছায়ার কল্পনায়
এখনও ভেসে আছি
এই তীব্র প্রবাহে যতক্ষণ ভেসে থাকা যায়।
দুঃখ পাবে মনে
মৃত্যুঞ্জয় হালদার
তুমি কবি দুঃখ পাবে মনে
সবাই এখন বন্দি গৃহকোণে
কেমন করে তোমার জন্মদিন
স্মরণেতে দিনটা করি রঙিন!
'করোনা'য় গ্রাস করেছে বিশ্ব
প্রাণ বিয়োগে আমরা বড় নিঃস্ব
কারো মনে নেই সুখ- সখ- শান্তি
বিশ্বজুড়ে চলছে যে অশান্তি!
কোথায় বলো তোমায় রাখি আজ
সবখানেতে 'করোনা' করছে বিরাজ!
বিষাদ মনে তোমায় সাজাই ফুলে
তোমার গানে উঠুক হৃদয় দুলে।
গন্তব্যহীন গন্তব্য
অনুকূল বিশ্বাস
লাল নদী একদিন থেমে যাবে
নীল প্রবাহ করবে তাকে গ্রাস ।
অজান্তে, শ্যাওলা গতি করে রোধ ,
বেড়ে ওঠে পাথরের টিলা থরেথরে
রক্তিম প্রবাহ ভুলে যায় অচিন গন্তব্য।
তখন সেই জলে সাঁতার কাটতে থাকে না কেউ
জেগে ওঠে অসমতল চর;
সেদিন তুমি একা , শুধুই একা
একাকিত্ব সঙ্গী লড়াই জীবন্তকাল।
চারিদিকে অথৈ শূণ্যতা, অস্পষ্ট নির্জনতা;
তুমি সেদিন একলব্য সত্যের মুখোমুখি
যা খন্ডানো তোমার ক্ষমতার অতীত;
একদিন যার কাছে পেয়েছিলে বাঁচার স্বাধীনতা।
চোখ মেলে আছো তবুও গুহার অন্ধকার
শিহরণ জাগানো নির্বীকার শীতলতা,
তুমি দৃশ্যের মাঝেও অদৃশ্য,
সকলের মনে বাস করেও তুমি নিঃসঙ্গ।
যেদিন এসেছিলে শাখ-উলুতে হয়েছিল আহ্বান;
আজ শুধুই ফ্যাকাশে জয়ধ্বনি ,
মন খারাপের বাতাস বড্ড ভারী
বেদনায় রজনীগন্ধা ঝরে পড়ে অনাদরে।
এসেছো তাই তো ফিরতে হবেই বন্ধু,
সময়ের লাল জবা সব ঝরে গেছে---
সাঙ্গ হয়েছে লীলা, কর্তব্যের দায় হয়েছে সমাপ্ত,
তৈরি হও, দিতে হবে পাড়ি গন্তব্যহীন গন্তব্যে।
অজানা ভাষার মানচিত্র
দেবস্মিতা দাস
সামনে উন্মুক্ত মানচিত্র।
উদাত্ত অনুদাত্ত নিটোল রেখা নির্দেশিত।
কোমল তরুণ ভাঁজে,
তোমার জাহাজ আমার বন্দরে উপনীত।
পথভোলা পথিকের মনে
কেন পথ দেখালে সাগর সঙ্গমে?
তোমার দেহের অজানা ভাষায়
এ দিকভ্রান্তের দিন কাটে সংযমে।
যৌবন মানচিত্র নিয়ে
কেন করলে অজানা ভাষায় মন্তব্য?
যদিও দিকনির্দেশ সুস্পষ্ট
তবুও বলি এ নয় আমার গন্তব্য।
শব্দ সাজি
সত্য সুন্দর (অনুপম)
একান্তে আজ তোমার কি কাজ
সবাই জানে। ফুল ফুটেছে কোন কাননে
সৌরভে ঐ ভ্রমর মাতে মৌ রবে
প্রানের টানে। ফুটছে লাভা কোন মননে।।
কপট এ রাগ দারুন নিদাঘ
সময় জুড়ে। অস্থিরতা বিপদ টানে,
দুলছে ভেলা এ কালবেলা
মলিন সুরে। সাধছে গলা অবাক প্রানে।।
বাঁকা বাঁশের বাঁশরী
শুভাশিস দাস
সাড়ে নয়বার "ছিন্নপত্র" পড়েও
রবি ঠাকুরকে ঠিক ছুঁতে পারিনি,
তাঁর মনস্তত্ব আর আমার বোধশক্তির
মাঝে অনুভব করি এক আলোকবর্ষ পথ,
কবিগুরুর লেখা গান 'রবীন্দ্র সংগীত'
আর "অগ্নিবীণা"র বাদক লিখলে "নজরুলগীতি" কেন হয়
সেটা যারা বোঝেনা তারাই হয়তো
ঠিক করেন কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ,
রবীন্দ্রজয়ন্তী না নজরুল স্মরণ?
স্রষ্টার আবার জাত কি,
পাণ্ডুলিপিরা তো ভেদাভেদ মানেনি,
কবিদের খাগের কালিরা তো ফারাক খোঁজেনি হিন্দু-মুসলিম পাঁচিলে ।
তবে এখনও কেন অদৃশ্য বিরোধ
রবীন্দ্র-নজরুলে?
মঙ্গলের জঙ্গলে
মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস
মঙ্গলে এসে দেখে জঙ্গল ভারি,
মামু বলে, "সামু, সাফ কর তাড়াতাড়ি৷
পৃথিবীতে জানিসই তো কত জঙ্গল
জ্বালিয়েছি, ধ্বংসেছি বেঁধে দঙ্গল৷
এই গ্রহে আবারও যে হবো মালামাল,
কি রে সবু, চুপ কেন? পড়ছে কি লাল?
তেড়ে আসে ওরা কে রে? মঙ্গলি প্রাণি?
হ্যাঁ রে, ওরা ভালবাসে খুবই হানাহানি?"
"মামা দেখ, ডিম ফুটে চোখ মেলে ছানা,
মঙ্গলি ডাইনোর আগুনের ডানা৷
চল মামা, চট করে রকেটেতে চড়ে
ফিরে যাই সেই চেনা পৃথিবীর ঘরে৷"
"কি বিপদ বুঝলাম আজ হাড়ে হাড়ে,
মঙ্গলে আসবো না মঙ্গলবারে৷
কাগজের মান্দাস
অনুপ কুমার সরকার
ভাসিয়ে দিলাম গাঙের পাড়ে-
উঠবে তোমার ঘাটে !
তুমি বসে থাকবে বিকালে সুলপীর ঘাটে ।
আমি থাকবো উপল উপকূলে।
কলার মোচার খোলে-
ভেসে ভেসে পৌঁছাবে ।
উজান স্রোতের টানে ।
নারকেল পাতার কাঠি দিয়ে ছেড়া কলাপাতায়,
লেখা থাকবে তবুও ভালোবাসি ।
অভিমানী দরজায় গিয়ে হাঁক দেবে -
ভেজা ভেজা ব্যাথা নিয়ে খুলে দেখবে তুমি,
পাছে যদি ঢেউ এসে ডুবে যায়,
তুমি ছিলে অপেক্ষায় ব্যাথা ভরা কান্নায় ।
কাগজের নৌকায় খবর দিও তুমি-
আমি থাকবো দাওয়ায়-
বৃষ্টি জলের বন্যায় এসে পৌঁছাবেই আমার আঙিনায় ।
চক্রব্যুহ
চামড়ার ভাজে গুটি বসন্তের কারাবাস ;
অট্টালিকা বা কুঁড়ে ঘরেই কী স্বাধীন বসবাস ?
খাদ্যজালের অভ্যন্তরে দুমরে মুচরে পেঁচানো -
মানবতার আঁতুরঘরে নাই আজ লেলিহান দ্বীপশিখা ৷
শব্দ দিয়ে সংলাপ নয়, শিকল
আমি বুনি ।
হিসাবের অক্ষরগুলো এভারেস্টের চূড়ায় বসেই গুনি ।
অপেক্ষারা প্রহর গুনতে গুনতে -
বন্দি এখন আমারই আঁতুরঘরে ।
মৃত জীবাশ্মের গায়ে রঙীন কিনাঙ্কিত উপচে পড়ে ।
মস্তিষ্কের রান্নাশালায় সব ঘুলঘুলি বন্ধ প্রায় !
ভেজা কান্নার কলোরোলে -
যোগ বিয়োগের হিসাবেই নিমেষে ইতি টানল ।
বিছানা
অর্কজ্যোতি ভট্টাচার্য্য
শরীর এলিয়ে দিলে কিছুক্ষণ চুপচাপ
এক মিনিট নীরবতা পালনের পর
আমরা ছটফট করি ৷
ডানা ঝাপটাতে থাকা পাখিটার ঠোঁটে
লেগে আছে রাতের পোশাক,
একে একে যেগুলো আমরা খুলে রেখেছি
বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে ।
প্রিয় মল্লার
সৌরভ কুমার পোদ্দার
ফুল সে এক, প্রিয় ছিল খুব,
শ্রাবণ মেঘে থাকত বুকের কোনে৷
রৌদ্র আতর শান্ত দু'হাত ছুঁয়ে-
মিশত ভোরে, পাখির আহ্বানে৷
পথিক নামে অচেনা এক সুর,
প্রতিবারই ফিরে ফিরে আসে৷
সবুজ ঢাকা হালকা রাতের ছোঁয়ায়-
বর্ষাতি মুখ, সান্ধ্য জলে ভাসে৷
অনেকটা ভোর, উষ্ণমুখর তবু,
বৃষ্টি নামে সময় মেপে রোজ৷
রঙ সাজানো চেনা মুখের সারির-
হঠাৎ করেই ঠিকানা নিখোঁজ৷৷
■ নীরবে কষ্ট সহ্যের উপহার আছেই
অঞ্জলি দে নন্দী, মম
বিয়ের কয়েক মাস পর, প্রথম বেঙ্গল থেকে উত্তর প্রদেশের এয়ারফোর্স কোয়ার্টারে এসে আছি স্বামীর সঙ্গে। জঙ্গলে ঘেরা কোয়ার্টার। কয়েক মাস পর শীত কাল এলো। যখন এসেছিলাম তখন প্রথম বুঝলাম - কত ঠান্ডা হয় এখানে। বেঙ্গলে থাকতে তো আন্দাজই করতে পারি নি।
যাক। এবার বলি আমার সেদিনের কষ্টের কথা। দুটি ডিফেন্স থেকে পাওয়া কম্বল। দুটি স্বামীর কেন এয়ার পিলো। মাথার। আমার বাবার দেওয়া বোম্বে ডাইং-এর বেড সিট ও পিলো কভারস।
মেঝেতে একটি কম্বল পাত্তাম। এর ওপরে বেড সিট। এত দুটি হাওয়া ভরা মাথার বালিশ। রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা। কাঁচের জানলা। দুজনে মিলে ওতে শুতাম। একটি কম্বল গায়ে দিতাম। পতিদেব শোওয়ার একটু পরেই বিকট শব্দে নাক ডেকে ঘুমোতো। আর এমন বেঁকে বেঁকে পাশ ফিরত যে আমার ঠাঁই আর বিছানায় হত না। আমি মেঝেতে শুতাম। এবার গায়ের কম্বলটাও টেনে নিয়ে নিত। আমি জেগে। এবার ওর গায়ে এক মোটা জ্যাকেট। আমার কোনও গরম পোশাক নেই। একটি সুতির ম্যাক্সি। বাবা এদিকে আমার গ্রামের শ্বশুর বাড়িতে প্রচুর দামী দামী শীতের তত্ত্ব পাঠিয়ে দিয়েছে। সে সব অনেক পরে বাবার বাড়ি গিয়ে শুনলাম। বাবার বাড়ির কেউই জানলো না, আমার অবস্থা।
আর আমার বিয়েতে যৌতুক হিসেবে শাল কাঠের ডবল খাট, তোষক, গদি, মাথার ও পাশের বালিশ, বেড শিট, মশারী ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি......আমার বাবার বাড়ি থেকে আমার বরের বাড়ির সবাই মিলে নিয়েছে।
এক রবিবার আমার স্বামী তার কলীগদের মধ্যে একজনের কোয়ার্টারে নিমন্ত্রণ রাখতে আমায় সঙ্গে করে নিয়ে গেল। অনেক কাপেলস এসেছে। পার্টি হচ্ছে। সেখানে আমার পতিদেব বললেন, "আমার মিসেস সপ্তাহে একদিন স্নান করে। এতো নোংরা ও!" সবাই চুপ করে শুনলো। কেউই কিছুই বলল না। আসলে আমি ঠান্ডা জলে স্নান করতে পারতাম না। কিন্তু ও তো অনায়াসেই তা করতে পারতো। এরপর কয়েক দিন পর, একজনের স্ত্রী আমার কোয়ার্টারে বেড়াতে এলো। তখন আমার কর্তা অফিসে ছিল। তখন সে আমাকে বলল, "অঞ্জলি! তুমি কি করে এতদিন স্নান না করে থাকো?" আমি বললাম যে আমি গায়ে এতো ঠান্ডা জল ঢালতে পারি না। সে তখন বলল, "তুমি ঠান্ডা জলে স্নান কর? আমরা তো ইমার্সন রড দিয়ে জল গরম করে স্নান করি।'' এরপর সে তার স্বামীকে বলে আমার স্বামীকে দিয়ে একটি রড কেনাল। তখন আমি রোজ স্নান করতে লাগলাম। বরকে বললাম, "একটি সোয়েটার পেলে ভালো হয়!" বললো, "ব্র্যান্ডি খাও! বাবাকে বল পাঠাতে!" আমি তাই শীত বস্ত্র ছাড়াই রইলাম। দুটোর কোনোটাই করলাম না।
সকাল ছয়টায় বর অফিস বেরোতো। আগের রাতে চাল ও ডাল ভিজিয়ে রাখা করাতো এবং তা ভোর চারটের সময় ঠান্ডা জল সমেত শীলেতে নোরা দিয়ে বেটে, তাওয়ায় সরু চাকলী বানানো করাত। মিনিমাম 25 টি সে খেত। আর খাওয়ার আগে পাঁচটি অফিসে নিয়ে যাওয়ার জন্য টিফিন বক্সে প্যাক করার দিতাম, তা ই নিয়ে যেত। সব শেষ হলে তবে উঠতো। আমার একটিও থাকতো না। অফিস চলে গেলে আমি সারা রাত জেগে থাকা ঘুমটা ঘুমাতাম। এরপর বাসন মাজা।ঘর মোছা। ড্রেস কাচা ও শুকোতে দিতাম। আঙুলগুলো ঠান্ডায় বেঁকে থাকতো।
এরপর কয়েকমাস পর গ্রামে গেলাম। বর তার মাকে গরম জলে স্নান করার কথাটা বলল। সে তখন ছেলের হয়ে আমায় খুব বললো। আমি তো শীতে পুকুরে ছেলের মুতো কাঁথা কেচেছি। আমি ভাবলাম বর শোধ তুলছে। বন্ধুরা সবাই আমার হয়ে ওকে দিয়ে রড কেনানো করিয়েছিল, তাই। হায়! কোথায় বেঙ্গলের ঠান্ডা? আর কোথায় উত্তর প্রদেশের? আর আমার শ্বশুর বাড়ির কেউই শীতে গরম পোষাক পড়ে না। লেপ, কম্বলও গায়ে দেয় না। গরম জলে স্নানও করে না। কারণ ওদের দরকার হয় না। সবাই হাই প্রেসার ও হাই পার টেনশনের ওষুধ খায়, বারো মাসই।
এরপর বাবার বাড়ি গিয়ে শুনলাম বাবা প্রচুর শীতের তত্ত্ব পাঠিয়েছে, গ্রামের শ্বশুরবাড়িতে। তার সঙ্গে সোয়েটার কেনার টাকাও ছিল। আমার বরেরও শীত বস্ত্র কেনার টাকাও দিয়েছিল। লেপ ও কম্বলের টাকা। খেঁজুর গুড়ের নাগরী। মোওয়া। মিষ্টি। ফল। চাল গুঁড়ি। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি আরও অনেক কিছু।
আমি বিয়ের আগে কখনও মেজেতে কম্বল পেতে শুই নি। কোনদিন সোয়েটার ছাড়া শীত কাটাই নি। কখনও লেপ গায়ে ছাড়া শুই নি। কখনও চাল ও ডাল বেটে পিঠেও করি নি। বাসন মাজি নি। ঘর মুছি নি। কখনও শীতে ঠান্ডা জলে স্নানও করি নি। কিন্তু আমি তো সবই করলাম।
আর এখন আমার দিল্লীর ঘরে হট এয়ার ব্লোয়ার চলে। তখন সব কিছু নীরবে শুধু সহ্য করেছিলাম। কেউই জানতে পারে নি আমার কষ্টের কথা। তখন বিয়ের আগে ভাবিও নি, এতো কষ্ট পেতে হবে। আবার তখন বিয়ের পর পরই ভাবিনি যে পরে এই অবস্থায় উঠতে পারবো। হট এয়ার ব্লোয়ার। দিল্লী। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি...
■ হৃদয়ের উষ্ণতার জন্য
মানস সরকার
মনে হয়েছিল, মেসোমশাই পাঠাবেন। আদর্শবাদী, দার্শনিক মানুষ। কিন্তু না। শেষ পর্যন্ত একটা সংক্ষিপ্ত বার্তা আমার মোবাইলে, - শুভেচ্ছা নিস। বউমাকে আমার স্নেহ। মেসো।
মন ভেঙে গেল। তবে আশা ছাড়লাম না। প্রণব নিশ্চই এ ভুল করবে না। একসঙ্গে একই স্কুলে বারোটা বছর পড়েছি। তখন থেকেই ওর লেখালিখির সূচণা। আর এখন তো প্রতিষ্ঠিত লেখক। হৃদয়ের একটু উষ্ণতা নিতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। যে সব প্রযুক্তি আমাদের হৃদয়ের উষ্ণতাকে কেড়ে নিচ্ছে, রীতিমতো তার বিরুদ্ধে কথা বলে।
নাঃ, হতাশ করল প্রণবও। ভেসে এল আমার মুঠোফোনে,- বিজয়ার শুভেচ্ছা নিস।
মনে তবুও শেষ ভরসাটুকু বেঁচে। সমর স্যর আছেন। প্রত্যেক বছর স্যরের ফ্ল্যাটে দেখা করে বিজয়ার নমস্কার করে আসি। ট্রান্সফার নিয়ে এতদূরে চলে এসেছি, উনি জানেন। ঠিকানাও দিয়ে এসেছি। ইতিমধ্যেই ওনাকে বিজয়ার নমস্কার জানিয়েছি কাগজে কালি দিয়ে, হৃদয়ের উষ্ণতা মাখিয়ে। সবাই যে ভুল করেছে, আমি জানি, উনি সে দলে পড়েন না।
কলিং বেল। বুকটা ধক করে ওঠে। পেয়েছি হৃদয়ের উষ্ণতা।
দরজা খুললাম। পোস্টম্যান নয়। ক্যুরিয়র। হোক গে যাক। হৃদয়ের উষ্ণতা তো বয়ে এনেছে।
- আপনার জন্য একটা প্যাকেট আছে। কলকাতা থেকে সমর রায় পাঠিয়েছেন, নির্লিপ্ত মুখ ক্যুরিয়র সার্ভিসের ছেলেটির।
আনন্দের জল বইছে আমার বুকে।
সই করে ক্যুরিয়রের ছেলেটিকে বিদায়,দিয়েই খুলে ফেললাম প্যাকেটটা। স্যর ল্যামিনেশন করে নিজের ছবি পাঠিয়েছেন। মনেও রাখতে পারেন। আসার সময় চেয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হৃদয়ের উষ্ণতা কোথায়! তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকি।
আবার আমার মেসেজ টোন। মেসেজ বক্স খুলতেই আবার হতাশা, - বিজয়ার আশীর্বাদ নিও। যা চেয়েছিলে, পাঠালাম। স্যর।
ইলেকট্রনিক অক্ষরের বন্ধন ছিঁড়ে সে উষ্ণতা আমার মনকে কিছুতেই ছুঁয়ে গেল না।।
প্রতিমা ভট্টাচার্য মন্ডল
রুমা ছোট থেকেই খুব নাচ গান ভালো বাসতো। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নাচ বা গানে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারেনি। মনে আক্ষেপ হতো।পাড়ায় প্রতিবছর রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের দিনে রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে অনুষ্ঠান হতো, সকলেই প্রায় তাতে অংশ গ্রহণ করতো। রবীন্দ্রসঙ্গীত,নৃত্য পরিবেশনের জন্য নাম লেখাতো। সকলেই কোন না কোন বিষয়ে পার্টিসিপেট করতো। কেও সুন্দর আবৃত্তি করতো।
রুমা দেখতো আর ভাবতো, আমি ও যদি ওদের মতো রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারতাম, রবীন্দ্রনাথ কে শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু একটা করে দেখাতে পারতাম। তাহলে খুব ভালো লাগতো কিন্তু সে লজ্জা পায়, যদি ঠিকঠাক পারফেক্ট পারফরম্যান্স করতে না পারে তাহলে সবাই খুব হাসবে, মজা করবে। এই সব ভেবে রুমা কখনো মঞ্চে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ কে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেনি।
এরপর একদিন সময়ের সঙ্গে রুমার বিয়ের বয়স হয়ে যায়। ভালো ছেলে দেখে, সুন্দর একটা পরিবারের ছেলের সঙ্গে রুমার বিয়ে হয়ে যায়। রুমার বিয়ের পর প্রায় দু'বছর হতে চললো, রুমা মা হতে চলেছে। বৈশাখ মাসের দশ তারিখে রুমার ডেলিভারী হবার কথা কিন্তু দশ তারিখে কোন ব্যাথা নেই, ডেলিভারী হবার লক্ষন নেই। রুমা চায় তার নর্মালে বাচ্চা হোক তাই দশ তারিখে নার্সিংহোমে নিয়ে গেলেও সিজার না করে চলে আসে। পঁচিশ তারিখ ভোর বেলায় বাড়িতে নর্মালে মেয়ে হয়। নাম রাখা হয় বৈশাখী। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের দিন এলো কোল আলো করে বৈশাখী।
■ পালক
প্রণব রুদ্র
পালক হালকাভাবে হাওয়া বাতাসে ভাসতে থাকে। ভারী বস্তু আর পালক বায়ু শুন্যস্থানে একই সাথে মাটিতে নাকি পড়ে। বৈজ্ঞানিকভাবে তা প্রমাণিত। মানুষের জীবন আছে বলে এ থিয়োরি খাটেনা এখানে !
গত তিনমাস থেকে কেমোথেরাপি চলছে পালকের। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে ও। কষ্টের ভারগুলো কবেই পড়ে গেছে মাটিতে !
পালক এখনো ভাসছে, ভেসেই চলেছে । ভাসতে ভাসতে আকাশের কাছে যাচ্ছে।
■ ফিরে আসা
আকাশ কর্মকার
ডির্ভোসের শুনানির আজ শেষ দিন। হয়তো আজ শেষবারের মতো নিজেদের প্রিয় চারচাকাটা করে বেরিয়েছেন দুজনে, চালকের আসনে পীযূষ ও ঠিক তার পাশে বর্তমান স্ত্রী সুষ্মিতা; হ্যাঁ ঠিকই পড়লেন- 'বর্তমান' কেন না তাদের আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ হতে এখনো বাকি। আদালতে পৌঁছানোর আগে হঠাৎ পীযূষ বলে উঠল চৌরাস্তার মোড়ের ক্যাফেটোরিয়াতে একবার যাওয়ার কথা যেটা সাক্ষী ছিল তাদের পথচলা শুরুর; সুষ্মিতাও কোনো অজুহাত দিল না। খানিক পর সেখান থেকে বেরিয়ে 'ভুলবশত' গাড়িটা ঘুরিয়ে সোজা বাড়ির পথে রওনা দিল দুজনে। চোখের কোণে লুকিয়ে রাখা আনন্দধারা কে চেপে মা জিজ্ঞেস করলেন- "কি রে তোদের ডির্ভোসটা আজও হল না? আবার কবে যেতে বলল?" বাবা পেপারটা নামিয়ে পীযূষের কাঁধে হাতটা রেখে বললেন-"তোরা কি সত্যিই ছাড়তে গেছলি নাকি নিজেদেরকে নতুন করে ধরতে আবার ?" পীযূষ ও সুষ্মিতা নিশ্চুপ; নীরব চোখ মাপে গভীরতা।
■ অবলুপ্তির পথে
অভিজিৎ রায়
পাফিন পাখিটি তবুও আশাহত হয়নি। তার দুটি সন্তান, সম্ভবত তাদের লুপ্তপ্রায় প্রজাতির অবশিষ্ট দুটি প্রাণের মুখে তুলে দিতে হবে খাদ্য। অথচ চারিপাশ যেন নিরবচ্ছিন্ন শীতল মরুভূমি।
বছর পাঁচেক আগের চিত্রটি ছিল অন্য প্রকার, যখন এই সাদা শীতল শুভ্র আস্তরণের জগৎটায় পাফিনের বাহারি রঙের শরীর দেখে মনে হত যেন বসন্তের মনোহারী ফুলের দল। এখন সবই অতীত।
পাফিন পাখিটা হন্যে হয়ে খুঁজছে একটু খাদ্য। চারিপাশের শুধুই হাড়ের রাজ্য। পোল বিয়ার, স্নো লেপার্ড অথবা শীল মাছ সবই এখন অবলুপ্ত।
এখন শুধু একটিই উপায় অবশিষ্ট, আর তা হলো, নিজেকেই খাদ্য হিসেবে তার দুটি সন্তানের সামনে তুলে ধরা। অন্তত আরো দুটি দিন তারা এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। কিন্তু তারপর? হয়তো তার দুটি সন্তানের একটি, অন্যটিকে ঠিক একইভাবে ছিঁড়ে...। আর ভাবতে পারলোনা পাফিন পাখিটা। তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘ নিশ্বাস।
■ পরিবর্তন
অবাস্তব ডায়েরী
এই কয়েক মাস হল কানাইয়ের দোকানে বিক্রিবাটা খুব একটা ভালো হচ্ছে না। এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত বেশ বিক্রিবাটা হচ্ছিলো। কিন্তু ওই যে গেলবার ওই বড়ো রাস্তার ধারে কি একটা মল না গল কি একটা হয়েছে। সব মানুষ জিনিসপত্র কিনতে সবসময় ওখানেই ছুটছে। সামনের ফ্ল্যাটের সোমনাথ দা যার কিনা কানাই এর দোকানে প্রায় প্রতি রোববার আসতো চিকেন মশলা কিনতে সেও প্রায় কয়েক দিন যাবৎ আর আসে না। কানাই ভেবে পায় না ,ওই বড়ো মলটায় এমন কি আছে যা তার দোকানে নেই।
করোনা আতঙ্কের জেরে সারা দেশে লকডাউন ঘোষিত হয়েছে। দেশে সব ট্রেন ,বাস ,অফিস কলেজ আর ছোট বড় সব মল বন্ধ। পাড়ায় পাড়ায় খুলে রয়েছে শুধু কানাইয়ের মত মুদির দোকান গুলো।আজ পাড়ার প্রায় অনেক মানুষ সবজি,মসলা এসব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আশায় ভিড় করেছে কানাই এর দোকানে। করোনা কবলিত মানুষের কাছে কানাইয়ের দোকান আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। করোনা এভাবেই কানাইয়ের দোকানের দাম অনেকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।
■ দিবাস্বপ্ন
দেবব্রত রায়
নিশিকান্ত বোধহয়, একটু ঘুমিয়েই পড়েছিল । "বোধহয় "কেন, নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছিল নইলে,
অমন একটা স্বপ্ন সে দেখলোই বা কী করে! কিন্তু,
স্বপ্নটা যে ঠিক কী ছিল সেটাই নিশিকান্ত ঘুম থেকে জেগে উঠে আর মনে করতে পারছেন ! নিজের মনেই নিশিকান্ত চুকচুক করে একটা শব্দ করে উঠলো । তবে, স্বপ্নটা যে বেশ বিন্দাস ছিল সেটা কিন্তু নিশিকান্ত হলপ করে বলতে পারে। কারণ,ঘুম ভাঙার ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের জীভের-ই একটা চুকচুকুনি আওয়াজ নিশিকান্ত-র কানে এসে ঠেকেছিল। ঘুমটা একটু আলগা হতেই, নিশিকান্ত ঠোঁটের কোনে হাত বুলিয়ে যেন একটু লালার ছোঁয়াও পেয়েছিল !
ঘুম থেকে উঠে নিশিকান্ত অনেক্ষন বিছানায় গুম মেরে বসে রইলো। না, কিছুতেই স্বপ্নের বিষয়টা মনে পরছে না ওর। স্বপ্নের ব্যপারটা যাতে না গুল্লিয়ে যায় তাই পেটটা বাথরুমে টম্বুর হয়ে থাকা সত্বেও সে বিছানার থেকে এক ইঞ্চিও নড়লো না। ততক্ষণে ওর গিন্নী মাধবীলতা বন্ধ দরজায় ধপাধপ আওয়াজ করতে শুরু করেছে, বলি, এগারোটা বেজে গেল, কখন আর স্নানঘরে যাবে শুনি!
নিশিকান্ত-র মনটা ক্রমেই খারাপ হতে শুরু করলো।নিঘঘাত স্বপ্নটা ভালো ছিল কিন্তু, ঘুমটা ভাঙতেই সব কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল ! কিছুতেই আর স্বপ্নের কথাটা মনে পড়ছেনা ওর ! বাইরের আওয়াজগুলো ক্রমে যতই বাড়ছিল ততই যেন স্বপ্নটা নিশিকান্তর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল।অনেক্ষন বিছানায় গুম মেরে বসে বসেই নিশিকান্ত ভাবলো, জীবনে সে এই সময়ে কোনোকালেই ঘরে থাকেনা, ঘুম তো দূরস্ত।অর্থাৎ, দিনের বেলায় স্বপ্ন দেখা তার কস্মিনকালের অভ্যাসেও নেই আর তাছাড়া, দিবাস্বপ্ন কার কবেই বা কী কাজে লেগেছে! কথাটা মনে হতেই নিশিকান্ত উঠে শোবার ঘরের দরজাটা খুলে দিল আর , সঙ্গে সঙ্গে বাইরের আলো এসে ভেতরের সমস্ত ডিপ্রেশন মুহূর্তে কাটিয়ে দিল!
■ চুপকথা
জয়তী পাত্র প্রামাণিক
প্রতিদিন রোদপোড়া ক্লান্তির ফিরতি পথে ট্রেনের কামড়ায় এক দশ- বারোর দু বিনুনির সাথে দেখা হয়।কখনো বা ডালমুঠ,বাদাম চিট কিংবা তিন টাকার ছোট্ট দিলখুশ।হাসিমুখ,হাসি চোখ,হাসি হাসি এপাশ ওপাশ।
সেদিন দেখি নাকে আবার ছোট্ট নোলক। অবাক হয়েছি। এত কচি নোলক আশেপাশে চোখে পরেনা।এ ক'দিনে বুঝিই নি অমন মিষ্টি হাসি,দুষ্টু নোলক জন্ম থেকেই কথাহারা।
মায়ের বুক জুড়ে এক আকাশ বিষন্নতা,এক সাগর জলোচ্ছ্বাস।শুনলাম পড়াশুনো এগোবে না খুব বেশিদূর।তাই নোলক নূপুরে বেড়ি বাঁধা।
ও মেয়ের মা,কী করে বোঝাই বলো তো,দু একটা কাজল-টিপ জন্ম বোবা, আর কিছু মেয়ে-জন্ম বলেই ভাষাহারা।
আমরা সবাই রূপকথা,
চুপকথা আমরা সবাই ।।
সর্বান্তে
■ পরিবেশ হুল
অনিরুদ্ধ ঘোষ
যখন কেবল ছিল নতুন সৃষ্টির রাজত্ব তখন মানুষ তাকে বাঁধা দিয়েছিল। যখন সে তার নিজস্ব গতিতে ছিল গতীয়মান তখন মানুষ হাতে ছুড়ি, বল্লম নিয়ে বিরোধিতা করেছিল। এই অশেষ জগতের নির্দিষ্ট নিয়মাবলিতে লাল দাগ কেটেছিল মানব সমাজ। ছাড়িয়ে গেছিল তাদের বাস্তব সীমানা, উপচে পড়েছিল তাদের অর্থ বমি এই মানবিক মাতৃ দেহে। তখন সব চলছিল মানুষের হাতে, সময় বশ মেনেছিল, জীবকূলের পরিনতি ছিল নিয়ন্ত্রিত।
সময় যেমন বয়ে গেল, ঠিক তেমনই পরিবেশ আজ ছুটে এল, তীব্র ক্রোধে, অস্বাভাবিক যন্ত্রনায় কাতর হয়ে ধেয়ে এল উড়ন্ত জ্বলন্ত নক্ষত্রের মত যার উত্তাপে ভস্মীভূত হয় এ যুগ।
এই পরিবেশ হুল, এই বিদ্রোহ আজ মানুষের বন্ধ করে দিল জীবন যাপনের রীতি, শিকলে বাঁধল প্রাণ, বাঁচিয়ে রাখল তবু মারল না। আজ সে প্রতিশোধের আড়ালে বুঝিয়ে দিতে চায় যে সত্তা প্রধান তাকে প্রধান রাখো, কখনও জটিল করোনা, মর্যাদা দাও তার অস্তিত্বকে যার দ্বারা তোমার অস্তিত্ব বর্তমান।
|| ধন্যবাদ ||










Comments
Post a Comment