সমাজের বর্ণ স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকায় আপনাকে স্বাগত ~ Welcome to Sworobarna Literary Magazine | এই বছরের নতুন নিবেদন -- সমাজের বর্ণ | অণুগল্পে সমাজের নানান রং এর মেলা | রবিবর্ণ | স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা - ২০২১ 🙏 ধন্যবাদ ~ Thank You 🙏 মা দেবীকা মিস্ত্রী সঞ্জীবনী প্রথম যেদিন মিমিকে দেখেছিল, বাঁচিয়েছিল একটি বড়োসড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার হাত থেকে। কোলে তুলে নিয়েছিল ছোট্ট মিমিকে।সেদিন মিমিও সঞ্জীবনীর বুকে মাথা রেখে, বেঁহুশ হয়ে "মা" বলে ডেকেছিল। সঞ্জীবনীর মধ্যে জেগে উঠেছিল মা-এর একটি রূপ। সেই ঘটনার পর, বহুবার সঞ্জীবনী মিমির সাথে দেখা করার চেষ্টা করে। কিন্তু, তাকে মিমির কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। মিমিও অনেকবার সঞ্জীবনীর কাছে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। ঠিকই তো, সঞ্জীবনীকে ছোট্ট মিমির কাছে কেন আসতে দেবে এই সুস্থ সমাজ। সে যে, নপুংসক, হিজড়া, ছক্কা। কারোর কারোর চোখে ...
যাযাবরের সংসার
স্বপঞ্জয় চৌধুরী
স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা
খালের ওপরের নড়বড়ে সাঁকোখানা খুব সাবধানে পার হয় সাহারা। খালের দুধারে হালকা বেগুনি রঙের কলমি ফুলগুলো বাতাসে দুলে দুলে তার পারাপারের ঘটনাটাকে অবলোকন করছে। একটু দূরেই কয়েকটা ছেলেমেয়ে গর্ত খুড়ে কী একটা যেন খোঁজার চেষ্টা করছে যেন খুব মহামূল্যবান কিছু। সাহারা বুঝতে পারে তারা কী করতে যাচ্ছে। তার পূর্ব পুরুষের আদিম পেশা এটা। ছেলেরা গর্ত ছেড়ে কিছু সময়ের জন্য সাহারার দিকে তাকায় মুখে কিছু না বললেও তারা চোখের ভাষায় যেন সাহারারাই সাহায্য কামনা করছে। সাহারাও এগিয়ে গেল গর্তের দিকে। সর পোলাপান সর সর একজন জায়গা করে দেয় সাহারাকে। নদু মুন্সীর ছেলে বারেক সাবলটা বাড়িয়ে দেয় সাহারার দিকে। সাহারা কয়েকটা কোপ গর্তের মুখে দেয়ার সাথে সাথে পাক্কা আট হাত লম্বা একটা বিরল প্রজাতির গোখরো সাপ বেড়িয়ে আসে। সাহারার মুখে ভয়মিশ্রিত একটা শুভ্র হাসি দেখতে পাওয়া যায়। গেরস্তের বউ হওয়ার পর এই তৃতীয়বার সে সাপ ধরলো। গেলো বছর বাড়ির রান্নাঘর থেকে শাশুড়ি মায়ের দেখা একটা অজগরের ছানা ধরেছিল। তারপর তার কিছদিন বাদেই নদু মুন্সীর বাড়ি থেকে একটা দাঁড়াস সাপ ধরেছিল। সেই থেকে গায়ে সাপ ধরার কথা উঠলে বেদেকন্যা সাহারার ডাক পড়ে। কিন্তু সাহারার স্বামী ভজন আলী ব্যবসায়ী মানুষ। তিনি সাপ বিচ্ছু ধরা পছন্দ করেন না। যদিও বিয়ের আগে সে সুন্দরী সাহারাকে পাওয়ার জন্য সাপ পছন্দ করার নাটক করতো। কিন্তু মনে মনে সে সাপকে ভীষণ ভয় পেত। এই সাহারার মন জয় করতে তাকে কম বেগ পেতে হয়নি। তার উপর সমাজে বেদে সমাজকে নিগৃহিত করা হয় প্রতি পদে। কেবল মাত্র রুপ আর গুন থাকলেও অনেকেই সমাজে ভালো বংশের ছেলে কিংবা মেয়েকে বিয়ে করতে পারেনা। তাদের স্বগোত্রীয় লোকের ভিতরেই হয় বিবাহ আচার অনুষ্ঠান। ভজন আলী ভাঙারির ব্যবসা করে। তার একটা বড় ট্রলার আছে। তো একবার ইঞ্জিন খারাপ হওয়ায় মাঝনদীতে ট্রলার বন্দ হয়ে গিয়েছিল। সেই পথ দিয়েই যাচ্ছিল বেদেনি সাহারাদের নৌকা। সাহারার মা ফতুবিবি ভজন আলীকে নৌকায় তুলে নেয়। সাহারার দিকে চোখ পড়তেই ভজনের মাথার ভিতর কাল বৈশাখের ঝড় শুরু হয়। তার ঠোঁটের কোনের তিল, লতানো কোমরের ভাজে যেন সর্পিনীর সংগম খেলা করে। তার কন্ঠ রুদ্ধ হয়, হাত পা হিম হয়ে আসে। যেন সুযোগ থাকলে এই মুহূর্তেই বিয়ে করে ফেলে সে। সেই দিনের পর প্রায় সপ্তাহখানেক মিয়াবাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়ানো ছিল। প্রতিদিনই কোন না কোন অজুহাতে নৌকায় গিয়ে দেখা করে আসতো সাহারার সাথে। তো একদিন সাহারা তার মায়ের সাথে সাপের খেলা দেখিয়ে ফিরছিলেন। গাঁয়ের মোড়ল চাকলাদার সাহেবের নজর পড়ে সাহারার দিকে। সে তাদের পথ অবরুদ্ধ করে দাঁড়ায়। তা কই যাইতাছো সুন্দরী বাইদ্যানী। আমার লগে লও খুশি কইরা দিমুনে। সাহারা তেড়ে এসেছিল চাকলাদারের দিকে। খুশি করতে চাস সালা কুত্তা। আমার বাক্সে ভি বিষ, মুখে ভি বিষ, শরীরেও বিষ বাঁচতে পারবি না। মোড়ল সাঙ্গ পাঙ্গ পাঠিয়ে তার নৌকায় হামলা চালায়। তার বাক্সে রাখা গোখরো সাপ পিটিয়ে মেরে ফেলে। থানায় গিয়েও বিচার পায়নি। অসহায় এ বেদেনিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয় ভজন আলী। শর্ত হচ্ছে সাপের খেলা বা সাপ বিচ্ছুর কারবার করা যাবে না। তো অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দু'তিনবার সাপ ধরতে হলো তাকে।
আজকের ধৃত সাপটি সে তার মা ফতুবিবিকে উপহার দিবেন। এই গাঁ থেকে মাইল বিশেক দূরে তাদের দল ঘাটি পেতেছে। সেই খবর শুনেই মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। ভজন বহুবার তাকে বলেছে সংসারে চলে আসুন। কিন্তু যাযাবর মন সংসারে বাঁধা পড়বার নয়। তার উপর আবার মেয়ের জামাইর বাড়ি। সাহারা অটোরিকশায় করে রহমতগঞ্জ এর উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। এই গাঁ থেকে ভাড়া চল্লিশ টাকা। তিনি একটি সিমেন্ট এর ব্যাগে সাপটিকে বেঁধে নিয়েছেন। অটোতে বসা এক মধ্য বয়স্ক লোক তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন। পাশের লোকটা গা ঘেঁষে বসেছেন। যেন সম্ভব হলে গায়ের উপরেই চড়ে বসেন। আকাশে খানিকটা মেঘও করেছে। বৃষ্টি হতে পারে। রাস্তার দুদিকে বাশ ঝাড় তার মাঝখান দিয়ে চলছে অটো। সাহারার বুকের ভিতর ধক করে ওঠে। স্বামী ব্যবসার কাজে পাশের জেলায় ট্রলার নিয়ে গিয়েছেন। বিকেলে ফেরার কথা বৃষ্টির কারণে যদি দেরি হয় তাহলে অনেক বকা শুনতে হবে। মার খাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। তিনি এত যে সাপ ধরেছেন। তিনি সাপকে কখনো ভয় পাননি ভয় পেয়েছেন দেহলোভী পুরুষ জাতিকে। পাশের লোকটা ঘুমের ভান করে তার গায়ের উপর পড়ে যাচ্ছিল। সাহারা তার হাতের ব্যাগটা একটু নাড়া দেন। ব্যাগের ভিতর থেকে সাপটি ফোস ফোস করে আড়মোড়া দিয়ে ওঠেন। মধ্য বয়স্ক লোকটা বলেন- মা জননী ব্যাগের মধ্যে কী?
চাচাজি কোন ব্যাগ ডাইন হাতেরটা না বাম হাতেরটা? দুইডাই কও। বামহাতেরটায় আছে কচুর লতি, নারকোল, আম আর কয়েকটা কাপড়। আর ডাইন হাতেরটায় বেশিনা মাত্র আট হাইত্যা একটা গোখখুর সাপ। সাপের কথা শুনে ঘুমের ভান করা লোকটা লাফিয়ে উঠে। কই সাপ, কই সাপ আফা। মধ্য বয়স্ক লোকটাও ভয়ে কুকড়ে ওঠে। অটোর ড্রাইভারও গাড়ির গতি যেন কমিয়ে দেয়। পরের স্টপেজই পুরো অটো খালি হয়ে যায়। শুধু সাহারা বসে থাকে আর এক মাইল পরেই রহমতগঞ্জ। অটোচালক যেতে অস্বীকৃতি জানায়। সাহারা অটোচালককে বলে ব্যাগটা খুলমুনি ভাইজান। অটোচালক ভয়ে ভয়ে আবার চালু করে অটো। নদী ঘাটে অনেকগুলো নৌকা ভিড়ানো আছে। সাত নাম্বার নৌকাটা ফতুবিবির।
সে ফতুবিবিকে দেখেই কান্নায় জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘ দুই বছর পর মায়ের দেখা পেলেন। অনেক রোগা হয়ে গেছে মা। এবার তাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে তার কাছে নিয়ে রাখবেন। ভজন ফিরলে তার সাথে কথা বলবেন এ বিষয়ে। আকাশে মেঘ গুড়ুম গুড়ুম করে ডাকছে। এদিকে ভজন আগেই কাজ ফিরে এসেছে। পার্টির কারগো পথেই পেয়ে গিয়েছিল। তাই মাঝ পথেই মাল খালাস করে টাকা নিয়ে দুপুরের মধ্যেই ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেই সাহারাকে খুঁজছেন। তার মা ঢাকা গিয়েছে ছোট ছেলের বাসায়। বাড়িতে কেউ নেই।
এবাড়ি ও বাড়ি সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। তার উপর প্রতিবেশী মহিলারা নানা কুকথা কানে ঢালছেন। সবুরের মাতো বলেই বসলো- দেহো কোন নাগরের লগে দেহা করতে গেছে, নারকোল, কচুরলতি, আম এইগুলান দেখলাম ব্যাগের মধ্যে ভরতে। ভজন রেগে অগ্নীমূর্তি ধারণ করে আছেন। তার উপর ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। আইজ আসুক মাগি ঘরে ওর লাউংগাগিরি বাইর করতাছি। ঘন্টাখানেক পেড়িয়ে যায়। সাহারার দেখা নেই। সবুরের মা ভাত নিয়ে আসে লও বাবা চাইরডা খাইয়া লও। অই ছেমরি কহন না কহন আহে ঠিক নাই।
অনেক বৃষ্টি হচ্ছে চারিদিকে প্রায় অন্ধকার। এই বৃষ্টির ভিতরেই সাহারা রওয়ানা দিয়েছে। একটা অটো দাড় করানো আছে প্যাসেঞ্জার নেই। তাকে অনেক কষ্টে তিনগুন ভাড়ায় রাজী করানো গেলো। অটো চলছে বৃষ্টি হচ্ছে সাথে ঝড়ো বাতাস। অটোকে যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। রাস্তার দুদিকে বাঁশঝাড় আর আখের ক্ষেত। অবশেষে অটো মিয়াবাড়ির ঘাটের কাছে এসে ভিড়লো। রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে হয়ে আছে। অনেক কষ্টে আংগুল গেঁথে গেঁথে হেঁটে সাঁকোর কাছে আসে। নড়বড়ে সাঁকোটি ভেংগে পড়ে আছে ভজনের ভগ্ন হৃদয়ের মতো। ভাগ্যিস একটা ডিংগি ভিড়ানো ছিলো অর্ধডুবন্ত অবস্থায়। সেই ডিঙিতে খোঁচ দিয়ে দিয়ে এ যাত্রায় খাল পাড় হয়। বাড়িতে সে স্বামী ভজনকে দেখতে পায়। খানিকটা বুকের ভেতর অজানা ভয়ে ধক করে ওঠে। গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বলে তুমি কখন এলে? ভজন রেগে হুংকার দিয়ে তোর লাংগের লগে দেহা করতে যাওয়ার ইট্টুপর সিলান
কী আমি নুংরা মানুষ- এই কথা বলেই ভজন মারতে শুরু করে সাহারাকে। পাটখড়ি আর আখ দিয়ে প্রচুর মারে সাহারাকে। মারতে মারতে তাকে ঘরের বাইরে বের করে। বাইদ্যানী কুনহানকার। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। সাহারার বিধ্বস্ত শরীর পড়ে আছে কাদায় লুটিয়ে। তার সারা শরীরে সাপের মতো আঁকাবাঁকা রেখা অংকিত হয়েছে। অঝরে বৃষ্টি পড়ছে তাকে আবারো ডিঙি বেয়ে খাল পারহতে হবে। ফিরে যেতে হবে যাযাবরের সংসারে।
Comments
Post a Comment