সমাজের বর্ণ স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকায় আপনাকে স্বাগত ~ Welcome to Sworobarna Literary Magazine | এই বছরের নতুন নিবেদন -- সমাজের বর্ণ | অণুগল্পে সমাজের নানান রং এর মেলা | রবিবর্ণ | স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা - ২০২১ 🙏 ধন্যবাদ ~ Thank You 🙏 মা দেবীকা মিস্ত্রী সঞ্জীবনী প্রথম যেদিন মিমিকে দেখেছিল, বাঁচিয়েছিল একটি বড়োসড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার হাত থেকে। কোলে তুলে নিয়েছিল ছোট্ট মিমিকে।সেদিন মিমিও সঞ্জীবনীর বুকে মাথা রেখে, বেঁহুশ হয়ে "মা" বলে ডেকেছিল। সঞ্জীবনীর মধ্যে জেগে উঠেছিল মা-এর একটি রূপ। সেই ঘটনার পর, বহুবার সঞ্জীবনী মিমির সাথে দেখা করার চেষ্টা করে। কিন্তু, তাকে মিমির কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। মিমিও অনেকবার সঞ্জীবনীর কাছে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। ঠিকই তো, সঞ্জীবনীকে ছোট্ট মিমির কাছে কেন আসতে দেবে এই সুস্থ সমাজ। সে যে, নপুংসক, হিজড়া, ছক্কা। কারোর কারোর চোখে ...
সতীন্দ্রনাথের গল্প
সমাজ বসু
গত চব্বিশ ঘণ্টায় সারা দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এক এ পৌঁছেচে। মহারাষ্ট্রের ধারভি অঞ্চলের উক্ত আক্রান্তকে কোয়ান্টামে রাখা হয়েছে। চোখে চশমা,খয়েরি রঙের টাই পরা টিভির ঘোষকের দরাজ গলায় খবরটা শুনেই সতীন্দ্রনাথ নিজের একটা হাতের লোম ধরে টানতেই বেশ একটু ব্যথা অনুভব করলেন। তার মানে খবরটা সত্যি। একেবারে আইএসআই মার্কা মারা একশ ভাগ সত্যি।
---- হ্যাগো, সেই কখন পাঁপড়গুলো দিয়ে গেছি, এখনো একটাও মুখে তোলনি? তাই বলি,এত চুপচাপ কেন? তোমার মুখে খাবার পড়লেই তো, খাওয়ার চেয়ে আওয়াজই বেশি হয়। তাই ছুটে এলাম। এদিকে পাঁপড়গুলো তো ভেজা কাক হয়ে তোমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
--- আরে গিন্নি, সাতানব্বই দিনের মাথায় একটা দারুণ খবর শুনলাম।আজ যে কি আনন্দ হচ্ছে। একটা পাঁপড় ভেঙে আমার মুখে দাও দেখি।
--- যতসব আদিখ্যেতা। এই বলে সতীন্দ্রনাথের স্ত্রী,অরুণা দেবী ব্যাস্ত পায়ে আবার কিচেনেই সেঁদিয়ে গেলেন।
সতীন্দ্রনাথ ফের টিভির খবরে ঢুকে পড়লেন। টিভির ভল্যুমটা বাড়িয়ে দিয়ে তিনি পাঁপড়ের শব্দকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিলেন।
আমাদের মুম্বাইয়ের প্রতিনিধি অলক রায় এইমাত্র জানালেন, এই অপ্রত্যাশিত আনন্দের পরিস্থিতিতে সবাই পথে নেমে পড়েছেন। যদিও সরকারিভাবে লকডাউন প্রত্যাহারের ঘোষণা করা হয়নি। মহারাষ্ট্র সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে,যে আগামীকাল সেখানে সমস্ত সিনেমাহলেই বিনা টিকিটে দর্শক যে কোনো ছবি দেখতে পারবেন। খবর চলাকালীন ঘোষকের মুখে হাসি ফুটতে দেখে সতীন্দ্রনাথের মুখেও হাসির ছায়া পড়ল।
বিরতিতে যাবার আগে আপনাদের আরো একবার মনে করিয়ে দিই, খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘরে থাকবেন না। এতদিনের পড়ে থাকা কাজগুলো আস্তে আস্তে সেরে ফেলুন। নিজে নাচুন। সবাইকে নাচান। কোত্থাও যাবেন না,একটা ছোট্ট বিরতির পর আবার ফিরে আসছি।
রাতের খাওয়া শেষ করে সতীন্দ্রনাথ ঘরে ঢুকে দেখেন,স্ত্রী একমনে কি সব লিখে চলেছে।
--- রাত তো অনেক হলো,খেয়ে নাও। স্বামীর আওয়াজ পেয়ে কাগজটা শাড়ির আড়ালে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন অরুণা দেবী। আজ আর কোনো বিরক্তি,রাগ কিংবা সন্দেহ কাজ করছে না তার মনে। ঘাড় অবধি নেমে আসা চুলগুলো কাঁধ থেকে সরিয়ে পেছনে ঠেলে,লম্বা দাঁড়িতে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন। জীবনে কোনদিন বাড়িতে দাঁড়ি কাটেননি। আর তিন মাস হতে চললো শ্রীবদন সেলুনের আয়নায় মুখ দেখেননি। ভালই হয়েছে,গিন্নির চোখে এখন তিনি শুধুই রবীন্দ্রনাথ। তাই ভাবলেন,নামটা যখন পাওয়া গেছে,একটু চেষ্টা করতে দোষ কি? অন্তত একটা সতীন্দ্রসঙ্গীত তো হবে।
তারপর প্রথম একবছর কপিরাইট নিজের কাছেই রাখবেন। পরের বছর বিক্রি করে দিলেই চলবে।
আজ গভীর রাতে, সবাই গেছে লনে লকডাউনের বিদায় সম্ভাষণে।। যেতে হবে আজ এ রাতে গিন্নি রবে আমার সাথে করোনাকে পাঠাই নির্বাসনে।। লকডাউনের বিদায় সম্ভাষণে।
--- গিন্নি দ্যাখো, তোমার রবীন্দ্রনাথ কেমন সুন্দর একটা সতীন্দ্রসঙ্গীত লিখেছে। বলেই লেখার কাগজটা স্ত্রীর চোখের সামনে মেলে ধরলেন,সতীন্দ্রনাথ।
--- তা হ্যাগো, কবিগুরুর মত তুমিও নোবেল পাবে? স্ত্রীর অকপট প্রশ্নে তিনি দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন,সময়ই বলবে।
--- শুভ বলছিল,তুমি নাকি এই কদিনে তোমার অফিসের ডিপার্টমেন্টের নামই ভুলে গেছ? অরুণা দেবীর কপালে চিন্তার ভাঁজ।
--- মাথার আর দোষ কি? তিন মাস হতে চলল ঘরে বসা। এখনও যেটুকু তোমাদের চিনতে পারছি, কিছুদিন পর হয়ত এটাও গুলিয়ে যাবে। সতীন্দ্রনাথের গলায় দ্বিধার সুর।
---- কাল অফিসে শুভকে সঙ্গে নিয়ে যেও।
---- তোমার যেমন বুদ্ধি। স্টাফ হাসাই আর কি! তাছাড়া শুভও তো এতদিন পর কাল কলেজ যাবে। আচ্ছা তুমি কি কাউকে প্রেমপত্র লিখছ? আমাকে আড়াল করে কি একটা কাগজ.....কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অরুণা দেবী হা হা করে উঠলেন।
---- বাবাকে আড়াল করে প্রেমপত্র আমি শুধু আমার সতুকেই লিখেছিলাম। তোমাকে লুকিয়ে প্রেমপত্র লিখতে যাব কোন্ দুঃখে! লিস্টটা তখনও শেষ হয়নি, তাই ভাবলাম একেবারে শেষ হলেই দেখাব।
--- কিসের লিস্ট?
উত্তরে যা শুনলেন,সতীন্দ্রনাথের মুর্ছা যাবার উপক্রম। এই তিন মাসের ভেতর যত অনুষ্ঠান গেছে,যেমন বিয়ে,অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ, জন্মদিন মায় সাধভক্ষণ আগামীকাল থেকে শুরু হবে সেইসব ফেলে আসা অনুষ্ঠান অভিযান। মিশন লৌকিকতা। একমাত্র শ্রাদ্ধোত্তীর্ণ বাড়িতে একটি সাদা মালা আর এক বাক্স মিষ্টি ছাড়া সবেতেই টাকার হরিলুট চলবে। লকডাউনের জমানো টাকা দশগুণ হারে বেরোবে, ভেবেই সতীন্দ্রনাথের রক্ত হিম হতে শুরু করেছে।
--- কিগো,কত বেলা অবধি ঘুমোবে? অফিস নেই, বাজার হাট নেই বলে কি পড়ে পড়ে ঘুমোতে হবে? গিন্নির ডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন সতীন্দ্রনাথ।এক মুহূর্তও দেরি না করে,দীর্ঘ এপিসোডের বিয়োগান্তক স্বপ্নটাকে দু হাতে ভালো করে রগড়ে দিলেন।
--- এই লকডাউন যে কবে উঠবে বাপু জানি না। আর ভাল লাগছে না।
--- কেন,খারাপটা কি আছো! এই যে বর্ণহীন সাদামাটা সহজ সরল জীবনযাপনে বুক ভরে বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নিতে পারছি, এই তো অনেক। বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে বললেন সতীন্দ্রনাথ।
Comments
Post a Comment