মা
দেবীকা মিস্ত্রী
সঞ্জীবনী প্রথম যেদিন মিমিকে দেখেছিল, বাঁচিয়েছিল একটি বড়োসড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার হাত থেকে। কোলে তুলে নিয়েছিল ছোট্ট মিমিকে।সেদিন মিমিও সঞ্জীবনীর বুকে মাথা রেখে, বেঁহুশ হয়ে "মা" বলে ডেকেছিল। সঞ্জীবনীর মধ্যে জেগে উঠেছিল মা-এর একটি রূপ।
সেই ঘটনার পর, বহুবার সঞ্জীবনী মিমির সাথে দেখা করার চেষ্টা করে। কিন্তু, তাকে মিমির কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। মিমিও অনেকবার সঞ্জীবনীর কাছে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল।
ঠিকই তো, সঞ্জীবনীকে ছোট্ট মিমির কাছে কেন আসতে দেবে এই সুস্থ সমাজ। সে যে, নপুংসক, হিজড়া, ছক্কা। কারোর কারোর চোখে তো আবার, সে মানুষের পর্যায়েই পড়ে না।
তবে, সঞ্জীবনী নিজের চেষ্টা চালিয়ে যায়। একদিন সে খবর পায়, মিমির দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। ইমিডিয়েটলি কিডনি না পেলে তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। সে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যায় মিমির চিকিৎসারত ডাক্তারের কাছে। জন্মগত একটি কিডনির অধিকারী সঞ্জীবনী, ডাক্তারের সাথে কথা বলে সবার অজান্তেই আরো একবার মিমির প্রাণ সঞ্চারকারিণী হয়ে ওঠে।
আজ, হসপিটালের মর্গে পড়ে থাকা, সাদা কাপড়ে মোড়া সঞ্জীবনীর মৃতদেহটি যেন একটি কথাই বলে চলে,"মিমি, আমায় একবার "মা" বলে ডাক!!"
ঘোলাটে আলোয়
কৃষ্ণেন্দু দাসঠাকুর
মুখে চওড়া মেকাপ। অনুপাতিক সাজগোজ। প্রতিদিনের মতো ওদের থেকে একটু দূরে ল্যাম্পোস্টের নিচে দাঁড়ালো। উঠতে বেশ দেরি হয়। দিনেও বেশ চাপ থাকে। বড় লাইটটা খুব কমই জ্বালা হয়। অল্প আলোর সাথে আধা অন্ধকারে জিনিসপত্রে ঠাসা আট বাই আট ঘরটা যেন যুুুবতী নদী। সন্ধ্যার এ-সময়টাতে বড়ো আলোর নিচে দাঁড়াতে বেশ একটু অন্য রকম লাগে। যদিও বারবার "রং বড্ড চাপা", " কালোর দিকে, কালোই বলা চলে" সেটা ঢাকতে মোটা দেনাপাওনা, বাধ্য হয়ে পিছিয়ে আসা... ওকে খুব বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হয় না।বরং চাহিদা একটু বেশিই। মাঝে মাঝে অবকাশ পেলে ভাবে-- এই যে আজ এক মাসে এতজনের মাঝ থেকে আমায় এতজন পছন্দ করে নিয়ে গেছে, তারা সব কোথা থেকে আসে!
নির্জনতার দেবশিশু
শুভ্রা ভট্টাচার্য
পাহাড়ের গা বেয়ে গাড়ী জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটছে। পুরুলিয়া থেকে পাঞ্চেৎ বাঁধের দিকে যাওয়ার পথে আদিবাসী গ্রামের নির্জনতা ডালিয়াকে কেমন এক অদ্ভুদ বুনো আবেশে অভিভূত করে তুলেছে। খুব দূরে দূরে দু একটা ছিটে বেড়ার ঘর চোখে পড়ছে। ড্রাইভারের থেকে জানা গেলো, ওরা এতোই গরীব যে দুবেলা পেট ভরে দু মুটো ভাত জোটে না, একটা জামাকাপড় শুকিয়েই লজ্জা নিবারণ করে। ডালিয়ার খুব ইচ্ছে করছিল গাড়ী থেকে নেমে ওদের সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসে। কিন্তু সহযাত্রীদের সময়ের দামের নিরিখে ওর এই পাগলামী মান্যতা পাবে কেন! তাই সে মন দিয়ে ড্রাইভারের থেকে ওদের গল্প শুনতে লাগলো। কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা গাড়ী থেকে পড়ার শব্দে ওর সম্বিৎ ফেরে। ড্রাইভার গাড়ী থামালে দেখে জলের বোতলের ব্যাগ পিছনের সিট থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে। ডালিয়া প্রমাদ গোনে, তারমানে জলের বোতলের উপরে রাখা খাবারের ব্যাগ আগেই পড়ে গেছে যা তারা টের পাই নি। গাড়ী পিছনে মোড় নিল। অল্প এগুতেই দেখে শতছিন্ন জামা পরা দুটি ১০/১২ বছরের বাচ্চা ব্যাগটা বুকে নিয়ে ওদের দিকে প্রানপনে ছুটে আসছে। ডালিয়া অবাক দৃষ্টিতে ভাবছে জনমানবশূন্য নির্জন জঙ্গলে এই দেবশিশু দুটির কোথা হতে আবির্ভাব যেখানে দারিদ্রতার ব্যাস্তানুপাতে তাদের মানবিকতা সভ্যতার কোন খামতি নেই!!
ফুলকি
তনিমা সাহা
অতিমারীর কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস সব কিনে আনতে হয়। সায়নও তাই আজকাল সকাল সকালই উঠে পরে। ইদানিং দোকান-বাজার করার সময় প্রায়ই দেখে একটি সাত/আট বছরের মেয়ে সবসময় হাত পেতে মুদিখানার দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকেই মেয়েটির হাতে খাবার তুলে দেয়। বাচ্চা মেয়ে দেখে কষ্ট হয়। তাই সায়নও দুদিন খাবার দিয়েছে। আজ আবার দেখতে পায় মেয়েটিকে ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে। কৌতূহল বশতঃ সায়ন জিজ্ঞেস করে, "অ্যাই, কি নাম রে তোর"? একগাল হেসে মেয়েটি বলে, "ফুলকি"। কি নিষ্পাপ মুখখানি মেয়েটার। সায়ন বলে, "হ্যাঁ রে তোর বাড়ির কেউ নেই। সবসময় তোকেই দেখি খালি.."। ফুলকি বলে, "আছে তো সবাই.. কিন্তু ওরা তো আসতে পারবে না..তাই আমি আসি"। সায়ন খাবারের প্যাকেটটা এগিয়ে দিতেই সেটা হাতে নিয়েই ছুট লাগায়। কি মনে হতে সায়নও পিছু নেয় মেয়েটির। একটু এগিয়ে দেখে ফুলকির আশেপাশে ছোটো বড়ো সাইজের কয়েকটা কুকুর ঘিরে আছে। ফুলকি ওদের হাত বুলিয়ে আদর করছে, নিজেও খাচ্ছে, ওদেরকেও খাওয়াচ্ছে।
গর্ব
রবীন বসু
—'তপু, শুনছিস, টিভিটা খুলে দ্যাখ্…' বাবার গলা পেয়ে সম্বিত ফিরে পায় তপোময় l আজ তাদের মাধ্যমিকের রেজাল্ট বের হবে, উত্তেজনা আর চাপা দুর্ভাবনায় খেয়ালই ছিল না কখন দশটা বেজে গেছে l তাড়াতাড়ি ওদের বসার ঘরে গিয়ে টিভিটা অন করে l স্টার আনন্দের নিউজ চ্যানেলে দিতেই ও চমকে ওঠে l সংবাদ পাঠিকা হাসিমুখে উত্তেজনা নিয়ে বলে যাচ্ছে— 'গরিব ঘরের বস্তিতে থাকা সুমনা এবার মাধ্যমিকে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে l সুমনার বাবা রিক্সা চালায় আর মা লোকের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে l অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বিনা কোচিংয়ে সে এই অভূতপূর্ব ফল করেছে l সারা পশ্চিমবঙ্গে ও দ্বিতীয় আর মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান পেয়েছে l তার এই সাফল্যে মুখ্যমন্ত্রী তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন l তার পড়ার যাবতীয় খরচ এবার থেকে সরকার বহন করবে…' ঘরে ততক্ষণে বাড়ির সবাই এসে হাজির হয়েছে l বাবা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন l দিদি বলে উঠল, 'আমি জানতাম, সুমনা খুব ভালো রেজাল্ট করবে।' মা'র তো চোখে জল এসে গেল l --'আমাদের রমার মেয়ে এত্তো ভালো রেজাল্ট করেছে !' আসলে সুমনার মা রমামাসি তপোময়দের বাড়িতে রান্নার কাজ করে l এছাড়াও তিন-চার বাড়িতে ঠিকে কাজ করে সকালে l সুমনার বাবা সুবল আঙ্কেল রিক্সা চালায়, কিন্তু ফুসফুসে অসুখ হওয়ায় ঠিক মত গাড়ি নিয়ে বের হতে পারে না l তাই রমামাসিকে লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার সামাল দিতে হয় l দুই ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয় l অবশ্য সুমনাও পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ঠোঙা তৈরি করে মাকে সাহায্য করে l এসব তপোময় জেনেছে মায়ের সঙ্গে রমামাসির কথা- বার্তার সময় l তপোময়ের চোখের সামনে সুমনার সরল মুখ আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ ভেসে উঠল l নানা প্রয়োজনে সুমনা তাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছে l তার ভাবতে ভালো লাগল যে সে সুমনাকে চেনে, তাদের পাড়াতেই সে থাকে l মনে মনে একটা গর্ব অনুভব করল l এমন সময় দিদি তাড়া দিল, —'কিরে হাঁদা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খবর দেখবি? যা, এসএমএস করে দ্যাখ্, তোর রেজাল্ট কী হল? পাশ না ফেল।'
শিবির বাংলা শিক্ষা
অসীম কুমার চট্টাপাধ্যায়
আমি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। টিউশন করে নিজের পড়ার খরচ চালাতে হত। সেন্ট্রাল রোডে একটা মাড়োয়ারী বাড়িতে পড়াতাম ছেলেটার নাম রাহুল সি এর ছাত্র রাহুলের বোন কলেজে পড়ে। ওর ডাক নাম শিবি। একদিন পড়াতে গিয়ে শুনি রাহুল এক বন্ধুর বার্থ ডে পার্টিতে গেছে। পড়া হবে না। ফিরে আসছি। ভেতর থেকে শিবি আমায় ডাকলো। হিন্দিতে বলল, স্যার, একটা কথা বলবো? বললাম, বলো আমাকে বাংলা শেখাবেন? মানে? আমার বাংলা ভাষা খুব ভালো লাগে কিন্তু লিখতে, পড়তে বা বলতে পারি না। আমার শেখার খুব ইচ্ছা। কলেজে দু একবার বলতে গেছি, আমার কথা শুনে বন্ধুরা হাসে মজা করে। বললাম ঠিক আছে শেখাবো। আমি একটু আগে চলে আসবো। তোমাকে পড়িয়ে তারপর রাহুলকে পড়াবো। সেদিন থেকেই শেখাতে শুরু করলাম। খুব দ্রুত শিখতে লাগলো শিবি। এরপরে আমি হিন্দিতে ওর খাতায় একটা করে বাক্য লিখতাম। শিবি বাংলায় অনুবাদ করতো। ট্রান্সলেশন মেথডই আমি শেখাতাম। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলাও শিখে গেল। আমার পরীক্ষার জন্য দু মাস যেতে পারিনি। পরীক্ষার পরে যেদিন গেলাম, গিয়ে দেখি শিবি নেই। রাহুল বলল, শিবির যেখানে বিয়ে ঠিক হয়েছে তাদের পছন্দ না শিবি বাংলা শিখুক। তাই বাবা ওকে মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। মনে মনে বললাম, নারী কবে স্বাধীন হবে?
দেখার চোখ
গোবিন্দ মোদক
ক্লাসে স্যার ঢুকলেন। তারপর স্বাভাবিকভাবেই বললেন - প্রিয় ছাত্ররা, আজ তোমাদেরকে একটি খুব সহজ প্রশ্ন করবো, দেখি তোমরা কেমন উত্তর দিতে পারো! এই বলে তিনি টেবিলে একটি কাঁচের গ্লাস রাখলেন, তারপর জলের জগ থেকে সেই গ্লাসের মোটামুটি অর্ধেক অংশ জল ঢেলে দিলেন। তারপর বললেন - তোমরা সবাই দেখতে পাচ্ছো? এবার বলো তো, কী তোমরা দেখছো?
ক্লাসের ফার্স্ট বয় সৌরভ দাঁড়িয়ে উঠে বললো - স্যার, গ্লাসটির অর্ধেক জল।
স্যার তাকে বাহবা দিয়ে বললেন, একদম ঠিক বলেছ। পাশে তুমি সুজন বলো।
সুজনও একই কথা বললো -- স্যার, গ্লাসটির অর্ধেক ভর্তি। এইভাবে ক্লাসের ছাত্রদের প্রায় সবাই একই উত্তর দিলো যে -- গ্লাসটির অর্ধেক জল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল একটি বোকাসোকা ছেলে, সে উত্তর দিলো -- স্যার, গ্লাসটির অর্ধেক খালি।
স্যার তাকেও বাহবা দিয়ে বললেন -- হ্যাঁ, তুমিও সঠিক উত্তর দিয়েছো। তোমাদের এই দু'টো উত্তরই সঠিক। প্রথম উত্তর যারা দিয়েছে, তারা সাদা চোখে যা দেখেছে তাই-ই বলেছে। তাদের দেখায় কোনও জটিলতা নেই, তাই তারা বলেছে গ্লাসটির অর্ধেক জলপূর্ণ। অন্যদিকে যারা বলেছে গ্লাসটির অর্ধেক খালি, তারাও সম্পূর্ণ সত্যি কথা বলেছে। তবে তাদের দেখার চোখ ঈষৎ আলাদা।
তবে যে কারণে আজকে এই প্রশ্নটি করা তার ব্যাখ্যা এবার আমি তোমাদেরকে দিই। তোমাদের এই দু'টি মত ছাড়াও আর একটি মতবাদ আছে। সেটি হলো -- গ্লাসটির পুরোটাই ভর্তি -- অর্ধেক ভর্তি জলে আর অর্ধেক বাতাসে ; এবং যাঁরা এই মতবাদ দেন, তারাই জ্ঞানী আর তাঁদের মতো এইরকম দেখার চোখ সকলের থাকে না। তবে কি ক্ষেত্রবিশেষে প্রথম এবং দ্বিতীয় মত পরিবর্তিত হলেও হতে পারে পরিস্থিতির রকমফেরে ; কিন্তু তৃতীয় মতই হলো দার্শনিক মত। তার কোনো বিকল্প নেই।
আজ এই পর্যন্তই। আবার আগামীকাল দেখা হবে।
ধর্ম প্রাচীর
উদয়ন চক্রবর্তী
জীবনযাত্রা বাঁচার ধ্যান ধারণা সবারই সময়ের সাথে পাল্টে গেলেও এখনও কত জায়গায় রক্ত জমাট বাধার মতো জমাট বেধে আছে পরম্পরার অহংকার বুকে জড়িয়ে অবুঝের মতো। মনামী সেই যবে থেকে জ্ঞান হয়েছে শুনে আসছে মানুষই সব। মানুষের ভেতর হরমোন নিস্কৃত আবেগ মাখা স্বভীমান আছে তা সব বাধাই জয় করে নিতে পারে। প্রেমের কোনো জাত নেই রঙ নেই উঁচু নিচু ধনী দরিদ্র নেই। এমনটাই হয়ে চলেছে সহস্র বছর ধরে। এই ধারণা বালির পাহাড়ের ধসের মতো ধসে পড়ল যে দিন খাবার টেবিলে ও মা বাবা কে একসঙ্গে বলল, আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি। সে এ বছর ডাক্তারিতে এম ডি করে বিদেশ যাচ্ছে আরও পড়তে মেডিক্যাল কলেজের আমার তিন বছরের সিনিয়র। মনামী ও এম বি বি এস এর চতুর্থ বছরের ছাত্রী। মা বাবা হৈ হৈ করে উঠলো। কোথায় বাড়ি বাড়িতে কে কে আছে দেখতে কেমন ---নাম কী। ওর নাম আনিসুর রহমান সবুজ ওকে সবাই সবুজ বলে ডাকে। ঝর থেমে যাওয়ার পর স্থির গাছেদের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল খাবার টেবিল। বাবা সুখেন্দু বিকাশ না খেয়ে উঠে চলে গেল, মা বলে উঠলো একিরে শেষে একজন মুসলমানকে ভালোবাসলি। তোর বাবা সাত্বিক বামুন। তাতে কী মা। বাবা তো একটা কলেজের রসায়নের অধ্যাপক। মাও টেবিল ছেড়ে উঠে চলে গেল, বলে গেল তোকে বেশি স্বাধীনতা দিয়ে আমরা ভুল করেছি। মনামী ভাবল বামন শব্দের আর একটা অর্থ হয় বেঁটে।ঠিক ধরেছেন এরপর এ গল্প পোনেরো বছর এগিয়ে গেছে। ওদের বিয়ে হয়নি।সবুজ বিদেশ থেকে ফেরেনি। বাবা জোর করে মনামীর বিয়ে দিয়েছে কিন্তু একবছরের বেশি টেকেনি। মনামী এখন একজন খ্যাতনামা নিউরোলজিস্ট। সকাল সন্ধ্যে রুগী দেখে সময় কাটে। আর বিয়ে করেনি সন্তানও নেই। সেদিন তিন জন রুগী দেখার পর চার নম্বর নামটা দেখে ও চমকে উঠলো। আনিসুর রহমান সবুজ। ও ঘরে ঢুকলো সঙ্গে এক বয়স্ক ভদ্র মহিলা বলল ওর দিদি। সবুজ ওর মুখের দিকে তাকায়নি বাজ পড়া গাছের মতো দেখতে লাগছে সবুজ কে। মনামী জিঙ্গাসা করল আপনার নাম কি। সবুজ তাকিয়ে দেখলো, শুকনো গাছে জল পড়ার মতো ওর মুখটা হয়ে উঠলো। মনামী বলল দিদি আপনি বাড়ি যান ঠিকানা টা দিন আমি কালকে সকালে আপনাদের বাড়ি যাব। চিন্তা করবেন না ও ঠিক হয়ে যাবে।
প্রতিশোধ
স্বর্ণব দত্ত
জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পাকা রাস্তার উপরে এসে দাড়ালো রবিন,প্রায় ঘন্টা তিনেক এই জঙ্গলে কাটাতে হয়েছে,সাড়া শরীরে কাটা ফুটে আর পোকামাকড়ের কামড়ে ক্ষতস্থান তৈরি হয়েছে,তার উপর বৃষ্টি ভেজা শরীরে বেশ অসস্তি বোধ করতে লাগলো রবিনের।তবে এটা নতুন কিছু নয়,এইরকম অভ্যেস তার আছে।রাস্তার পাশে একটা গাছের আড়াল থেকে ভালো করে দেখে নিল আশেপাশে পুলিশ আছে কিনা।ঘটনাটা ঘটেছে রাত্রি এগারোটা নাগাদ,একটা সোনার দোকানে চুরি করে পালিয়েই যাচ্ছিল কিন্তু পুলিশের চোখ আড়াল করতে পারে নি,অবশেষে সঙ্গী সাথীরা ধরা পড়ে কিন্তু সে এবারও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আজও পর্যন্ত সে ধরা পড়ে নি, প্রতিবার কোনো না কোনো উপায়ে সে বেচেঁ যায়,মনে মনে বেশ গর্বের সাথে বলতে থাকে এখনও সেইরকম পুলিশ জন্মায় নি যে রবিনের মত কুখ্যাত ডাকাতকে ধরবে।রাত তখন প্রায় তিনটে,আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোরের আলো ফুটবে, তাড়াতাড়ি এই চত্বর থেকে কেটে পড়তে হবে কিন্ত কোনো গাড়ির দেখা নেই।বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে অনেকক্ষণ হল,চারিদিক ফাঁকা, শুধু ঝিঝি পোকা আর ব্যাঙের ডাকে কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার শিকার।ঠিক এমন সময় দূর থেকে একটা গাড়ী আসার আওয়াজ পেল রবিন,কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে, গাছের আড়াল দিয়ে দূর থেকে গাড়িটাকে ভালো করে দেখলো,পুলিশের গাড়ি নয় একটা ছোট মালবাহী ভ্যান,বিপদ নেই ভেবে পিস্তলটা কোমরে গুঁজে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়াল,আর গাড়িটা তার পাস দিয়ে পেরিয়ে যাওয়ার সময় এক লাফে কায়দা করে উঠে পড়ল গাড়ির পিছনে,গাড়ির চালক টেরও পেল না।ছোটো জানাল দিয়ে আবছা আলোয় বুঝতে পারল দুজন গাড়ির ভিতরে বসে আছে তার মধ্যে একজন ড্রাইভার,একটা পুরানো হিন্দী গানের সুর ভেসে এলো তার কানে,জঙ্গলের রাস্তা ঠান্ডা হাওয়ায় এবার বেশ শান্তি অনুভব করলো রবিন,একবার পকেট থেকে থলিটা ভালো করে দেখে নিল সব মাল ঠিক আছে কিনা,একবার হাতে নিয়ে ওজনে বুঝতে পারলো বেশ ভালই দাম পাওয়া যাবে,এতে দু-তিন মাস আর কিছু না করলেও চলবে।এবার চোখ পড়ল গাড়ির পাটাতনের দিকে বেশ চমকে গেলো,একজন শুয়ে আছে কাপড় ঢাকা দিয়ে, পা দিয়ে লাথি মেরে দেখলো কোনো আওয়াজ নেই তারপর বুঝতে পারলো ওটা একটা মৃতদেহ,হয়তো সৎকারের জন্য নিয়ে যাচ্ছে,তবে সে ভয় পেলো না,সাড়া জীবন অনেক মানুষকে হত্যা করেছে তাই ভয় জিনিসটা তার আর নেই। মৃতদেহটার পাশেই বসলো রবিন,বুক পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে লাইটার জ্বালিয়ে সেটাকে ধরাতে গিয়ে আবার চমকে গেল,এবার সে চিনতে পারে মৃতদেহটা,একটা বৃদ্ধ লোকের,সেই লোকটা যাকে সে আজ হত্যা করেছে,পিছনে পুলিশ সে দৌড়াচ্ছে ঠিক সামনে এসে পড়ে এই বৃদ্ধ লোকটা,লোকটা তাকে আটকানোর চেষ্টা করে নি,কিন্তু কি করে যে পিস্তলটা থেকে গুলিটা বেরিয়ে গেল বুঝতে পারে নি রবিন।লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয় তার,মনে মনে ভাবে লোকটাকে না মারলেই হত, বিনা কারণে নিরীহ লোকটার প্রাণ গেল,পরের মুহুর্তে মনে মনে ভাবলো মালটা গেছে ভালো হয়েছে বুড়ো বয়স আর কতদিন বাঁচতো,না হয় আজ ওকে মুক্তি দিলাম।আর কিছু না ভেবে রবিন হাত পা ছড়িয়ে ভালো করে বসে, কিছুক্ষন পর অনুভব করলো মৃতদেহটা যেন নড়ে উঠল,এবার কিন্তু একটু ভয় পেতে শুরু করে সে ,তারপর যেটা হল তাতে তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল, হৃৎপিন্ডের বেগ স্পষ্ট অনুভব করতে পারল,দেখলো মৃতদেহটা উঠে বসেছে আর তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে, কি অমায়িক তার হাসি,বৃদ্ধ জানে সে তাকে খুন করেছে কিন্তু তার হাসির মধ্যে কোনো প্রতিহিংসার ছাপ নেই,হাসিটা যেন তার মুখেই লেগে রয়েছে,কিছুতেই মিলিয়ে যাচ্ছে না, বৃদ্ধের জায়গায় সেই থাকলে তার মুখে এই হাসি থাকতো না,থাকতো সাড়া শরীর জুড়ে প্রতিহিংসার আগুন,কিন্তু লোকটার হাসি যেন থামছেই চাইছে না,রবিন ভয়ে চিৎকার করে ওঠে,ঘুমটা ভেঙে যায় বুঝতে পরে এতক্ষন স্বপ্ন দেখছিল,সাড়া শরীর ঘেমে গেছে,কখন যে চোখটা লেগে গিয়েছিল বুঝতেই পারে নি।তখন ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে,রবিন দেখলো দেহটা বেশ মোটা লোহার চেন দিয়ে শক্ত করে বাধা রয়েছে,স্বপ্নটা মনে করে আপন মনে হাসতে থাকে,তবে এবার গাড়ী থেকে নামতে হবে, জঙ্গল পেরিয়ে এবার জনবসতি বহুল এলাকায় গাড়িটা চলে এসেছে,বেশি দেরি করা ঠিক হবে না, পুলিশ তাকে তন্নতন্ন করে খুঁজছে, এই ভেবে উঠে দাড়ায় রবিন,ভালো করে পকেটটা দেখে নেয়,পিস্তলটা কোমরে ভালো করে গুঁজে তৈরি হয়,এবার গাড়ী থেকে ঝাঁপ দেয়ার পালা,ভগবানের নাম করে ঝাঁপ দিতে যাবে ঠিক সেই মুহুর্তে চেনে পা লেগে রাস্তার আছড়ে পড়ে, পায়ে ভীষণ রখম চোট পেল, মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো,উঠে দাড়াতে পারলো না, পিস্তলটা দূরে ছিটকে পড়ে গেল। গাড়িটা কিছুদূরে গিয়ে দাড়িয়ে পড়লো,গাড়িটার ভিতর থেকে দুটো লোক তাড়াতাড়ি ছুটে এলো তার দিকে সাহায্য করতে কিন্তু এগিয়ে আসতেই পাশে পরে থাকা পিস্তল দেখে সন্দেহ হল তাদের,রবিন বুঝতে পারলো তার আর কিছু করার নেই,পিস্তলটা পড়ে আছে অনেকটাই দূরে সেটা তুলে নেয়ার ক্ষমতা তার নেই তাই অসহায়ের মতো পড়ে থাকলো সেইখানে,লোক দুটো মধ্যে একজন মুহুর্তের মধ্যে পিস্তলটা তুলে নিয়ে তার দিকে পিস্তলটা নিবদ্ধ করলো,আর আরেকজন পুলিসে খবর দিলো,রবিন তখন ব্যাথায় কাতর, চোখ তার বন্ধ হয়ে আসলো, মনের মধ্যে ভেসে উঠলো ওই বৃদ্ধের সেই প্রতিশোধ নেয়ার মুচকি হাসি।দূর থেকে ভেসে এলো পুলিসের গাড়ির আওয়াজ,আর কিছু সময় তারপর ধরা পড়লো কুখ্যাত ডাকাত রবিন।
না আসার কারণ
দেবকুমার মুখোপাধ্যায়
কদিন ধরে বৃষ্টি বাদলা -- সারাদিন নয়,
সকালবেলা একটু ঝিরঝির, তারপর
সারাদিন শুকনো। কাজের লোক আসছে
না। তবে কি অসুখবিসুখ কিছু করল?
এদিকে ঘরের কাজ করতে করতে
নাজেহাল অবস্থা। চারদিন পরে কাজে
আসতে তাকে বললাম -- "কদিন এলে না,
কী হয়েছিল?"
সে বললে -- "মেয়ে জামাই এসেছিল
জামাইষষ্ঠীতে। পয়সা নেই, আমি বলি
নি আসতে। তাও নিজেরাই বাজার করে
নিয়ে এসে হাজির।"
-- "তার জন্যে চারদিন?"
"মেয়ে জামাই থেকে গেল যে!"
এরপর কী বলব, আমি তো হতবাক।
Comments
Post a Comment