সমাজের বর্ণ স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকায় আপনাকে স্বাগত ~ Welcome to Sworobarna Literary Magazine | এই বছরের নতুন নিবেদন -- সমাজের বর্ণ | অণুগল্পে সমাজের নানান রং এর মেলা | রবিবর্ণ | স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা - ২০২১ 🙏 ধন্যবাদ ~ Thank You 🙏 মা দেবীকা মিস্ত্রী সঞ্জীবনী প্রথম যেদিন মিমিকে দেখেছিল, বাঁচিয়েছিল একটি বড়োসড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার হাত থেকে। কোলে তুলে নিয়েছিল ছোট্ট মিমিকে।সেদিন মিমিও সঞ্জীবনীর বুকে মাথা রেখে, বেঁহুশ হয়ে "মা" বলে ডেকেছিল। সঞ্জীবনীর মধ্যে জেগে উঠেছিল মা-এর একটি রূপ। সেই ঘটনার পর, বহুবার সঞ্জীবনী মিমির সাথে দেখা করার চেষ্টা করে। কিন্তু, তাকে মিমির কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। মিমিও অনেকবার সঞ্জীবনীর কাছে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। ঠিকই তো, সঞ্জীবনীকে ছোট্ট মিমির কাছে কেন আসতে দেবে এই সুস্থ সমাজ। সে যে, নপুংসক, হিজড়া, ছক্কা। কারোর কারোর চোখে ...
বারবেলা
শুভাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়
স্বরবর্ণ সাহিত্য পত্রিকা
রিংটোন এর শব্দে পকেটের মোবাইল ফোনটা বের করা মাত্র স্ক্রিনে ফুটে ওঠা ছবিটার দিকে তাকিয়ে অন্যান্য সময়ের মতো এবারেও বুকের ভেতরটা ঠিক একই রকম ভাবে ভরে উঠলো অনল বাবুর।
ছেলে ফোন করেছে।
' হ্যালো।'
' বাবা, আমি ট্রান্সপোর্টের অফিসে কথা বলে এসেছি। ওদের গাড়ি এসে মালপত্র তুলে নেবে। সেটা সোমবারও হতে পারে,মঙ্গলবারও হতে পারে। একটু পরে ওরা কনফার্ম জানাবে। মা কে চাপ নিতে একদম বারণ কোরো।'
' আরে তোর মা বললে কি আর শোনে। কবেকার অচল আধূলি,সিকি পয়সায় ঠাসা রং চটা মাটির ঘট, সেটাও নিয়ে যাওয়া চাই। বললে বলবে,"মা লক্ষীর জিনিস.. ফেলতে নেই" কী আর করবো। আমার দাদুভাই কোথায়?'
' স্কুলে গেছে বাবা। আর বোলো না,দাদান কবে আসবে,ঠাকুমা কবে আসবে..এই নিয়েই মেতে আছে সারাদিন। '
অনল বাবু মনে মনে হাসলেন। একেই বোধহয় বলে রক্তের টান।
' আচ্ছা দাদুভাই এলে আমায় একবার ফোনটা ধরিয়ে দিতে বলিস। আর গাড়ির ব্যাপারটা জানাস।'
' আচ্ছা। আমি অফিসের মোবাইল থেকে তোমায় রিং করবো। আজ রাখি বাবা। মায়ের সঙ্গে আর কথা বলা হলো না। অফিসের গাড়ি চলে এসেছে। '
' সাবধানে যাস।'
ছেলে রক্তিম মাস দুই হলো নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনেছে।এর আগে বাড়ি থেকে সল্টলেক আসা যাওয়া করতে খুবই অসুবিধা হতো ছেলেটার। এতটাই কাজের প্রেসার। কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারতো। কোনোদিন তাও পারতো না।
ফ্ল্যাট কেনার পর থেকেই বাবা মাকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসার জন্য ছেলে, ছেলের বউমা দুজনেই উদগ্রীব। গত পূজোয় ছুটিতে এসে রক্তিম বলে গিয়েছিল,' তোমাদের বয়স হয়েছে। একা একা থাকো, বড় চিন্তা হয়। এবার আমাদের সাথে চলো। দাদুভাই হাত টেনে ধরে বলেছিল,"আর তোমায় ছাড়ছি না দাদান। যেতেই হবে।"
সে যাত্রায় অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাড় পাওয়া গেলেও
শেষ মেশ স্বামী -স্ত্রী সীদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন, না এতো করে যখন ওরা বলছে তখন..।
এতো বছরের পৈতৃক ভিটে। কত দিনের কত স্মৃতি জড়িয়ে। সেসব ছেড়ে চলে আসতে খারাপ লাগবেই। কিন্তু এও তো ঠিক, ছেলে,বউমা, দাদুভাই.. সামনে থেকে মুখগুলোকে কতদিন দেখতে পান না অনল বাবু। পুজোয় সেই যে তিন দিনের জন্য ঘুরে গেছে রক্তিম,ছুটির অভাবে তারপর আর আসতে পারে নি।
ফেসবুকে ছবি দেখা আর সামনে থেকে দেখা কি এক? তার চাইতে শেষ বয়সে ছেলের কাছে ফিরে যাচ্ছেন, এর চেয়ে আনন্দের আর কিই বা হতে পারে।
পাশের ঘর থেকে সাথী বেরিয়ে আসে। হাতে একটা পাতলা মতো কিসের বই।
' শো কেসটা একটু আগে ঝাড়পোঁছ করতে গিয়ে এই বইটা পেলাম.. দ্যাখো, দ্যাখো। ভেতরে এক কোণে রাখা ছিল। '
রবীন্দ্রনাথের একটা নাটকের বই। মুকুট। ভেতরের পৃষ্ঠায় ফাউন্টেন পেনের কালো কালিতে লেখাগুলো এখনো জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে। ' আমাদের রক্তিম দাদার দশ বছরের জন্মদিনে দাদুভাইয়ের উপহার। '
ঠিক যেন টাইপ করা হরফ। ভেতরের একটা পৃষ্ঠাও ছেঁড়ে নি কিংবা পোকায় কাটে নি। দেখলে মনে হবে বুঝি সেদিনকার কিনে আনা।
সাথীকে বললেন অনল বাবু , ' রক্তিম হয়তো ভুলেই গেছে। এতো ছোটোবেলার উপহার। দাদুর স্মৃতিচিহ্ন।'
সাথী উৎসাহে বলে,' বইটা নিয়ে যাবো বুঝলে, রক্তিমকে দেখাবো। বউমাও বোধহয় দেখে নি।'
' সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু ছেলে আমায় কি বলেছে জানো? বলেছে, তোমায় বেশি চাপ না নিতে। ফ্ল্যাটের ব্যাপার, বোঝোই তো। তিন কামরার ঘর..যতো বড়ই হোক্, বাড়ির মতো কি আর...। অপ্রয়োজনীয় বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে কি করবে শুনি? অহেতুক বোঝা বাড়ানো। ওদের বিব্রত করা। নিজেরও শরীর খারাপ করা। হ্যাঁ, বইখানা হাতের কাছে রেখে দাও। বোঁচকার কথা ভাবতে গিয়ে এটা আবার নিয়ে যেতে ভুলো না..। '
কয়েক মূহুর্ত দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবে সাথী। হয়তো ছেলে বউমার দিকটাই চিন্তা করছিল। নতুন, সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট। বাড়ির কোন্ জিনিসটা সেখানে সদৃশ,কোন্ জিনিসটা বিসদৃশ..ধারণা নেই অতো। ফ্ল্যাটবাড়ির জীবনের সঙ্গে কোনোদিন অভ্যস্তও নয় সে। অনল বাবু নিজেও অভ্যস্ত নন। বাড়ির এই সংসারটা সাথীর নিজের। একেবারেই নিজের। এখানে সে তার মতো করেই চলতে অভ্যস্ত। এ অভ্যাস হয়তো জীবনই শিখিয়েছে। অনল বাবু সবটা বুঝবেন না। বুঝতে পারবেনও না।
সাথী রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। ঘরের এদিক সেদিক দেখছিলেন অনল বাবু। সিলিং এর কোথাও কোথাও ঝুল পড়েছে। ঝুলঝাড়ুটা নিয়ে এলেন। দিনে দিনে এই ঝুল হয়তো আরো বাড়বে। ধূলোর আস্তরণ তৈরি হবে কোথাও বা। তবু যেকটা দিন থাকা,নিজেদের ঘরগুলোকে একটু সাফসুতরো করে নেওয়া এই আর কি..।
সাফসুতরো করতে গিয়ে সিলিং থেকে কিছু ধূলো এসে পড়েছিল সামনের টেবিলের ওপর।ওপরের বইগুলোকে সরিয়ে টেবিলটা পরিষ্কার করছিলেন অনল বাবু। একপাশে ট্রানজিস্টার রেডিওখানা রাখা ছিল। ধূলো পড়লে সাথী ওটাকে পাতলা ন্যাকড়া দিয়ে পরিষ্কার করে। মুছে টুছে কি মনে করে রেডিওটা একবার চালিয়ে দিলেন অনল বাবু । কোনো একটা গানের আওয়াজ। ঝিরঝিরে অপরিষ্কার সাউণ্ড। এরিয়ালটা ধরে বেশ খানিকটা সময় কসরত করার পর আওয়াজ পরিষ্কার হলো। পুরোনো দিনের বাংলা ছবির একটা গান বাজছে। মহালয়ার আগের দিন নতুন ব্যাটারী কিনে এনেছিলেন অনল বাবু। বাকী দিনগুলো খেয়ালবশত কচিৎ কদাচিত একটু আধটু চালানো ছাড়া আর সেভাবে শোনাও হয় না রেডিওটা। মাঝখানে যে কতো মহালয়া কেটে গিয়েছে... অ্যামিউজমেন্ট নামক শব্দের হাত ধরে অজান্তেই বদল এসেছে জীবনের অভ্যাসে..। পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর আগেকার সেই যৌথ পারিবারিক আবহ আর আজকের দেখা এই বাড়িটা...।
ভাবতে গিয়ে অনল বাবুর মনে পড়ে গেল দিনটার কথা। পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক মহালয়া। আগের দিন সন্ধ্যাবেলায় আচমকা ঝড়বৃষ্টিতে বাজ পড়ে পুরনো ইলেকট্রিক রেডিওটা খারাপ হয়ে যায়। আর সারানো যায় নি। বাবা,মা,দাদা,মেজদা বাড়ির সকলের তো মাথায় হাত! রাত পোহালেই মহালয়া। এখন এই শেষমূহুর্তে, ঝড়বৃষ্টির রাতে কোথায় মেকানিক পাওয়া যাবে! কোথায় কি!
দূর্যোগ মাথায় করে অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষমেশ একটা অর্ধেক ঝাঁপি বন্ধ দোকানের মালিকের কৃপায় এই ট্রানজিস্টার রেডিওটা পেয়ে যান অনল বাবু। আজ এত বছর পরও তবু তো চলছে জিনিসটা। খারাপ হওয়া যাকে বলে, তা তো হয়নি।
মাঝে একজন মেকানিককে ডাকা হয়েছিল। বেটার সাউণ্ডের জন্য সে এই এরিয়ালটা লাগিয়ে দিয়ে বলেছিল, ' বহু পুরোনো জিনিস! কোম্পানি কবেই উঠে গেছে। আওয়াজ যে থেমে যায় নি এই তো অনেক! '
গানগুলো শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল অনল বাবুর।তাঁর মনে হলো, রেডিওটা সাথে করে কলকাতায় নিয়ে গেলে কেমন হয়? এতোবছর ধরে জিনিসটা পাশে পাশে রয়ে গেছে, ফেলে আসতে মন চায় না যেন।
মোবাইল ফোনটা খাটের ওপর রাখা ছিল। বেজে উঠলো। আননোন নাম্বার।
ফোনটা রিসিভ করলেন অনল বাবু।
'হ্যালো।'
'বাবা আমি অফিসের ফোনে কথা বলছি। ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে এইমাত্র ফোন করলো, সামনের সোমবার সকালে ওরা গাড়ি পাঠিয়ে দেবে। ধরো পোঁছাতে পৌঁছাতে মোটামুটি ঘন্টা দেড়েক। সকাল দশটার মধ্যে ঢুকে পড়বে ওরা।'
' মানে মাঝে আর একটা দিন। ঠিক আছে। '
রেডিওর আওয়াজটা আবার ডিস্টার্ব করতে শুরু করেছে। বোধহয় কোনোকারণে এরিয়ালটা সরে গেছে। সাউণ্ড ক্যাচ করতে পারছে না। ফোনটা ধরা অবস্থাতেই এগিয়ে গিয়ে সুইচটা বন্ধ করে দিয়ে এলেন অনল বাবু।
' কিসের শব্দ হচ্ছিল বাবা?'
একটু হেসে অনল বাবু বললেন, ' রেডিওটা চালিয়েছিলাম একটু। সাউণ্ডটা তো মাঝেমাঝে ডিস্টার্ব করে। আবার খানিকটা কসরত করলে ঠিক হয়ে যায়। জিনিসটা কাছছাড়া করতে মন চায় না রে। বাড়ির সঙ্গে কোথায় যেন মিশে আছে। তাই ভাবছিলাম...। '
একটু চুপ করে থাকে রক্তিম। হালকা নিঃশ্বাস ফেললো যেন। যেভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মানুষ। তারপর বললো,' ও আর কদিনই বা চলবে বলো। বাড়ি আঁকড়ে শুধু শুধু মায়া বাড়ানো...অনেকটাই সেরকম।'
কোথায় এসে যেন থমকে গেলেন অনল বাবু নিজেও। কি যেন ভাবছিলেন।
রক্তিমের গলায় এবার উচ্ছ্বাস খেলে যায়।
' জানো বাবা, তোমার আর মায়ের জন্য একটা কারাওকে কিনে এনেছি আমি আর মিতা। একদম রেডিওর মতো দেখতে ছোটো সাউজের বুম বক্স টাইপের জিনিস। তুমি তো পুরোনো দিনের বাংলা গান পছন্দ করো। সেরকম প্রচুর গান ওতে লোড করা থাকে। শুনেও শেষ হবে না। তোমার খুব ভালো লাগবে,দেখো।আচ্ছা তাহলে রাখি বাবা। মিতা গেছে তোমার দাদুভাইকে স্কুল থেকে আনতে। ফিরলে আমি বলেছি ফোন করতে।'
দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নীচে নেমে আসছিলেন অনল বাবু। পুরোনো রং চটা দেওয়াল। কোথাও বা প্লাস্টারের কিছুটা অংশ খসে পড়েছে। সিঁড়ির জানলার জাফরির গায়ে, ফাটল ধরা স্যাঁতসেঁতে বাইরের দেওয়ালের এদিক ওদিক গাছপালার শিকড় বড় হয়ে ছোটো ছোটো আগাছার মতো তৈরি হয়েছে। রক্তিম বলে,' এতবড় বাড়ি, কে করবে এসব মেনটেইনেন্স..তোমরা একা থাকো..তোমাদের পক্ষেও সম্ভব না..আমার পক্ষেও না..।'
হয়তো ঠিকই বলে।
মোক্তারি করা কষ্টের পয়সা টুকু জমিয়ে একদিন বাবা এই বাড়িটা তৈরি করেছিলেন। ধরাবাঁধা রোজগার ছিল না বাবার। একদিকে সংসারের জোয়াল টানা আর একদিকে ছেলেমেয়েদের মানুষ করা..তারই মাঝে মাথা গোঁজার মতো একটা কিছুর ব্যাবস্থা.. একা একজনের পক্ষে কতটা কঠিন, টানাটানির সংসারে তার আঁচ সেভাবে কখনো অনুভব করেন নি অনল বাবু। হয়তো প্রয়োজনে নিজেদের আধপেটা রেখে বাবা মা ই অনুভব করতে দেন নি।
আস্তে আস্তে ছেলেমেয়েরা বড় হলো। তাদের চাকরি বাকরি, বিয়ে থা, সংসার.. একটা একটা করে বেড়ে ওঠা ঘর গুলো সবাই মিলে একসাথে তৈরি বাড়ির চেহারা নিল একদিন।
দোতলা থেকে নীচে নামতে অনল বাবুর এখন কষ্টই হয়। বয়সে ভারাক্রান্ত বাড়িটার মতোই পায়ের গতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে এসেছে তাঁর। তবু রেলিঙ ধরে আস্তে আস্তে নেমে আসছিলেন তিনি। মনটা যেন চাইছে বড়..।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই প্রথম দুটো ঘর তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কতদিন হয়ে গেল! বড়দা মারা যাবার সাথে সাথে মাথার ওপরকার শেষ ছাতাটুকুও সরে গেল যেন। হাঁড়ি আলাদা হলো। সংসার আলাদা হলো। যে যার মতো করে সরিয়ে নিল নিজেদের পৃথিবীকে। বড় ভাইপো তার পরিবার নিয়ে আলাদা হয়ে গেল। মেজদাও একদিন চলে গেল ছেলের চাকরি সূত্রে। দিল্লিতে ছেলের ফ্ল্যাটে। একদিন যাদেরকে সাথে নিয়ে গমগম করতো বাড়িটা,আজ তারাই তালা বন্ধ করে চলে গেছে।
বারান্দা ধরে এগিয়ে গেলেন অনল বাবু। কিছু একটা খুঁজছেন যেন। মায়ের ঘরের সামনে এসে আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে পড়লেন।বাবা,মায়ের শূন্য খাট দুটো একে অপরের দিকে মুখ করে তাকিয়ে রয়েছে যেন। জানলা খোলা। চৈত্রের আলো এসে পড়ছিল। একতলার এই ঘরটুকু আর সামনে একটা ছোটো বারান্দা.. এইটুকুই করে উঠতে পেরেছিলেন বাবা। এইঘরেই ছেলেপিলেরা একসাথে গাদাগাদি করে থাকা, বেড়ে ওঠা, মানুষ হওয়া...। কাজের লোক বীণা এসে এখন রোজ ঘরখানা পরিষ্কার করে রাখে।
ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলেন অনল বাবু। বাবার খাটটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। খাটের ঠিক সামনে মায়ের বিয়ের ট্রাঙ্ক। তারওপর সেই ছোট্ট কাঠের বাক্সখানা..আজ আর নেই। ঐ বাক্সের ওপরই ট্রানজিস্টার রেডিওটা রাখা থাকতো।
হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি যেন জলছবি হয়ে ভেসে আসছিল অনল বাবুর দৃষ্টিপথে....।
মাটিতে পাত পেড়ে গোল হয়ে বসে খাওয়া দাওয়া করছে ছোটোরা,বড়রা মিলে। দুপুর তখন দুটো। রেডিওতে কথা ভেসে এলো....'রবীন্দ্রসঙ্গীতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ওঁর গান শুনতে চেয়ে অনুরোধ পাঠিয়েছেন হাওড়া থেকে...। '
পঁচাশি বছর বয়স্ক বাবা রোগাক্রান্ত, শীর্ণ,কাঁপাকাঁপা হাতখানা কোনোরকমে তুলে ধরে বোঝাতে চাইছেন, এবার সবাই একটু চুপ করো। কথা বলার শক্তি নেই। শুধু শীর্ণ হাতদুখানা...।
সবাই চুপ করে যায়। ছোট্ট রক্তিম দাদুর পাশে গা ঘেঁষে বসে। হয়তো গান শুনছে। হয়তো বা দাদুকেই দেখছে...।
ঘুঘু ডাকা দুপুরে খোলা জানলার বাইরে গাছপালা, পাতার ফাঁকফোকড় দিয়ে, হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে সে সুর...'প্রাঙ্গণে মোর শিরিষ শাখায় ফাগুন মাসে কি উচ্ছ্বাসে..ক্লান্তি বিহীন ফুল ফোটানোর খেলা...। '
চৈত্রের বাতাস উঠোনের রৌদ্রে মায়ের শুকোতে দেওয়া কুলের গন্ধে ভরপুর...।
কতোকাল হয়ে গেল! 'শুধু শুধু মায়া বাড়ানো ' ছেলের বলা কথাটা যেন প্রতিধ্বনিত হলো অনল বাবুর কানে। আরো একবার।
বাইরে কলিং বেল এর শব্দে মনটা সরে এলো অনল বাবুর।
দরজা খুলতে দেখলেন পাশের বাড়ির রজত দা দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
শুকনো মুখে বললেন, ' চলেই যাচ্ছেন তাহলে? কম দিন তো হলো না এক পাড়ায় কাটালাম। কতো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। একসাথে পূজোয় চাঁদা কাটতে বেরোনো, অফিসার্স কলোনির পার্কে বসে পেনশনার্স অ্যাসোসিয়েসনের সেই আড্ডা, কতো প্ল্যান প্রোগ্রাম...। পুরোনো মানুষ এক এক করে সব চলে যাচ্ছে দাদা...শেষে আপনিও..।'
অনল বাবু প্রতিবেশী বন্ধুর গায়ে হাত রেখে বললেন,' মাঝে মাঝেই চলে আসবো ইচ্ছে হলে। আপনাদের ভুলে যেতে পারি কখনো?'
মোবাইল বেজে ওঠে অনল বাবুর। স্ক্রিনে দাদুভাইয়ের মুখখানা। একগাল হাসি। ইস্কুল থেকে ফিরেছে বোধহয়।
রজত দাকে ছবিটা দেখিয়ে হেসে বললেন অনল বাবু, ' ওর জন্যই আরো বেশি করে যাওয়া..।'
ধরবার মুখে কেটে গেল ফোনটা। ডায়াল করতে গেলেন অনল বাবু, নিজেই।
উঠোন থেকে মায়ের ঘরের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছিল। একঝলক সেদিকে চোখ পড়ে গেল তাঁর। আগের সে দিন হলে রজত দা নির্ঘাত একগাল আরামদায়ক হাসি হেসে বলতেন, 'পাঁচ দশকের হেমন্ত মুখুজ্জে.. কজন জন্মায় বলুন দেখি মশাই এমন গলা নিয়ে! ফাঁকা দুপুর.. মেশোমশাইয়ের ঘরের খোলা জানলা.. সেখান থেকে আসা রেডিওর ঐ একটুকরো আওয়াজ.. এ যেন অন্য এক হাওয়া, বুঝলেন না..নিজের ঘরে আর পাই কোথায় বলুন...।'
বারবেলার দিনগুলির সে সুর না হয় রাখাই থাকুক স্বযত্নে.. পাঁচিলের পাশে যুগ যুগ ধরে ছায়া দেওয়া দেবদারু গাছটার শিকড়ের মতো। মনে হলো অনল বাবুর।।
Comments
Post a Comment